রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: নৌ ও বিমানবাহিনী নির্বাচনি পর্ষদ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প সরকারের      প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের হুঁশিয়ারি      সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির শপথ-দায়িত্বভার গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি      নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা      
খেত খামার
দেশি-বিদেশি দুর্লভ ফল ও সবজি চাষে সফল রেজাউল করিম
নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় দেশি-বিদেশী বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষে সফল চাষি রেজাউল করিম খন্দকার। দেশি-বিদেশি দুর্লভ ফল বাগান ও সবজি চাষের মাধ্যমে তিনি জেলাজুড়ে সাড়া ফেলেছেন। 

আলাপকালে রেজাউল করিম জানান, দুই একরের বাগানটিতে আম দিয়ে সূচনা হয়েছিল ফল চাষের। এখন আমই আছে ৫০ জাতে। ২০ জাতের আঙুর, ২০ জাতের লংগান (কাঠলিচু), দেশে অপরিচিত আমেরিকান হানি কাপোয়ার্ড, চুপাচুপাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ ফলে বাগানটি সমৃদ্ধ।

বাগানটির অবস্থান মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামে।

সরজমিন বাগান ঘুরে দেখা গেছে, এই বাগানে ৫০ আমের জাতের মধ্যে আছে আলফানসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, চেংমাই, পাকিস্তাানি চোষা, আমেরিকা পালমা, সামার বেহেশত, বৈশাখী, বান্দি নুড়ি, গৌরমতি, কাটিমন, থাই কাঁচামিঠা, কুনাই, বাউ-৩, বারি-১১, নাম ডাক মাই, হাড়িভাঙা, ব্ল্যাকস্টোন, মহাচনক, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, ব্যানানা, আম্রপালি, সুপার ভাগোয়া ইত্যাদি। ২০ জাতের আঙুরের মধ্যে আছে গ্রিল লং, এলিস, ফ্যান্টাসি, বাইকুলুর, জয়, ভিতুবি ব্ল্যাক, এবিউ জায়ান্ট ইত্যাদি। 

১০ জাতের কমলা ও মাল্টার মধ্যে আছে হানিডিউ, কমলা তারাক্ক, রুপি গ্রাপ, কারা কারা অরেঞ্জ, ওয়াশিংটন নেভাল, হেয়ার লুম নেভাল, সাউথ আফ্রিকান হলুম মাল্টা, চায়না কমলা, সিলেটি কমলা ও থাই-২। 

দেশি-বিদেশি অন্যান্য ফলের মধ্যে আছে আনার, ফুলে আরাকতা (ডালিম), মৃদুলা (ডালিম), আপেল, পারসিমন, নাশপাতি, ড্রাগন ফল, ত্বিন ফল, বযাকবেরি, লুকাট ফল, পেয়ারা, স্ট্রবেরি, রামবুটান, সালাক ফল, জামরুল, গোলাপজাম, তুরকি মালবেরি, লেবু, কাজুবাদাম, ফিলিপাইন আখ, আতাফল, শরিফা, এলোনা ইস্পানিশ, আফ্রিকান রেড পিচ, জায়ান্ট এবিও, নাশপাতি, ব্রাজিল  পেয়ারা, হানি কামকুয়াট, পেঁপে, জুজাবি ফলসহ নানা প্রজাতির ফল-ফুলের গাছ। 

সঙ্গে আছে নানা জাতের ফুলের গাছ, স্থানীয়ভাবে অপ্রচলিত নানা জাতের সবজি।নিজের আনন্দ, অন্যের আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে বাগান  বলা যায় এটি এখন দেশি-বিদেশি শতাধিক জাতের ফলে সমৃদ্ধ এক দুর্লভ উদ্যান। বিশাল বাগানটির উদ্যোক্তা রেজাউল করিম খন্দকার বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামের আজিজুর রহমান খন্দকার (পংকু মাস্টার) এর ছেলে। 

রেজাউল একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় ওই প্রতিষ্ঠানের কাজেই কাটে। গাছপালা, ফল-ফুল তাকে টানে। কাজের অবসরে এই ফল-ফুল তাকে আলোড়িত করত। ২০১৭ সালে শখ থেকেই বাড়িসংলগ্ন একটি টিলায় কিছু আমের চারা রোপণের মাধ্যমে তার আড়াল পড়া ইচ্ছাগুলো সামনে চলে আসে। আমগাছে ভালো ফলন হয়। এতে অন্য ফলের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। বাড়ি ও বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে বিভিন্ন জাতের ফুলও লাগিয়েছেন  রেজাউল। 

এই বাগান দেখতে অনেকে আসেন। রেজাউল করিম খন্দকার বলেন, হানি কাপোয়ার্ড ও চুপাচুপা-এই দুটি ফলের চারা ইন্দোনেশিয়া থেকে সংগ্রহ করেছেন। হানি কাপোয়ার্ড অনেকটা লিচুর মতো, খেতে সুস্বাদু। পাকলে জেলির মতো হয়ে যায়। চুপাচুপাও মিষ্টি একটি ফল। দেশি ফল দেশের বিভিন্ন নার্সারি থেকে সংগ্রহ করেন। বিদেশিগুলো সরাসরি বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেন। এই ফলবাগান সাজাতে তার এ পর্যন্ত আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশি-বিদেশী ফলের চারা রোপণের মাধ্যমে বাগানটি সমৃদ্ধ করেন। স্থানীয়রা বলেন, তার বাগানে বিভিন্ন জাতের ফলগাছ দেখে চোখ-মন দুটোই ভরে যায়। তিনি যে যত্ন মনোযোগ ও ধৈর্য নিয়ে বাগানটি গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়।

রেজাউল করিম বাগানে বিটরুট, চায়না গাজর, ব্ল্যাক টমেটো, তরমুজ, লাল মুলা, স্ট্রবেরি টমেটো, চেরি টমেটো ও ক্যাপসিকাম প্রভৃতির আবাদ করেন। বেশ কিছু জাতের মরিচও আছে। গতকাল ক্ষেত থেকে বিটরুট তুলে বাড়ির উঠানে পরিস্কার করতে দেখা গেছে তরুণ উদ্যোক্তা রেজাউল করিম খন্দকারকে।

চাষি জানান, গত বছর শখের বশে পরীক্ষামূলকভাবে বিটরুট চাষ করে সফল হওয়ায় এবার বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে সফল হয়েছেন। ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক গাছে ফলন এসেছে। ফল সংগ্রহ করে পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে আয়ের আশা করছেন তিনি। বিটরুট চাষে মাত্র দুই হাজার পাঁচশ টাকা খরচ হয়েছে তার। বাজারে দাম বাড়তি থাকলে দিগুণ লাভবান হওয়ার আশা করছেন তিনি।

বিটরুটের গাছ দেখতে অনেকটা পালং শাকের মতো হলেও রঙে ভিন্নতা আছে। এ সবজির ভেতরের রঙ গাঢ় লালচে বেগুনি। বীজ রোপণের দুই মাস পর মাটির নিচে হয় এ সবজি। প্রতিটির ওজন হয় গড়ে ২০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত। সালাদ, সবজি ও জুসের জন্য অভিজাত শ্রেণির হোটেলে এ সবজির বেশ কদর রয়েছে। দামও ভালো। গ্রামের বাজারেই এ সবজির কেজি প্রতি দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার কাছাকাছি। 

চাষি রেজাউল জানান, ডিসেম্বরের শুরুতে বিটরুট রোপণ করার উপযুক্ত সময় এবং তা উঠতে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। মার্চের শেষে ফসলটি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করার উপযুক্ত সময়। 

পুষ্টিবিদরা বলেন, পুষ্টিকর খাবার হিসেবেও এটি পরিচিত। উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের মহৌষধ হিসেবেও ফলটি কার্যকর। বিটরুটে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, কপার ও অন্যান পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। এ ছাড়া এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ক্যানসার, হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। ফসলটি ব্যাপকভাবে উৎপাদন করতে পারলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা সম্ভব।

রেজাউল করিম দৈনিক কর্মব্যস্ততার ফাঁকে নিজেই বাগানের পরিচর্যা করেন। ২০১৭ সালে শখের বশে বিদেশি আমের কয়েকটি জাত রোপণ কওে বাগান শুরু করেন। বর্তমানে বাগানটি দুই একর জমিতে বিস্তৃত। দর্শনার্থীরা আগমনের পাশাপাশি কৃষি উদ্ভাবনার শিখর হিসেবে বাগানটি দেখতে আগ্রহী। 

রেজাউল করিম জানান, বাগানের উদ্দেশ্য বিষমুক্ত নিরাপদ ফল উৎপাদন, পরিবারের চাহিদা মেটানো এবং ভিনদেশি ফলের অভাব পূরণ করা। ইতোমধ্যেই স্ট্রবেরি বিক্রি করে লক্ষ টাকার আয় হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফল বিক্রি করে আরো কয়েক লাখ আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাগানকে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারিত করে স্থানীয় কৃষকদের জন্য উদ্ভাবনী দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে। 

তিনি বলেন, গত কয়েক বছর আমের ভালো ফলন হয়েছে। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রিও করেছি। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশিকেও দিয়েছি। এবার ৫০ জাতের আম গাছেই মুকুল এসেছে। ভালো ফলনের আশা করছেন।

বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রেজাউল করিম শৌখিন ফল চাষি হলেও এমন একজন উদ্যোক্তা সারা দেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমি তার ফলের বাগানে কয়েকবার গিয়েছি। বাগানে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলের গাছ দেখে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারিত করার জন্য উৎসাহ দিয়েছি।’

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘রেজাউলের মতো অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে মানুষ রোগমুক্ত জীবনযাপন করতে পারবে। আমরা এমন উদ্যমী উদ্যোক্তা খুঁজছি। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খেত খামার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close