মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও জ্বালানি তেলের সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকটের আতঙ্ক এখন রাজধানীজুড়ে। স্টেশনে স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য ভিড় দেখা যাচ্ছে। এমনকি লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে কোনো কোনো স্টেশনে। শুধু তাই নয়, জ্বালানি বেশি সংরক্ষণ করারও চেষ্টা করছেন অনেকে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যেকটি ফিলিং স্টেশন কতটুকু জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে এবং ভোক্তারা কতটুকু জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন— সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলো ডিপো থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
যদিও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘জ্বালানি তেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের কাছে যথেষ্ট মজুত রয়েছে।’
অন্যদিকে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।’
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গুজব ও অপপ্রচারের কারণে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। তাই গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়— একটি মোটরসাইকেল দিনে ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
রসিদ দেখিয়ে তেল নিতে হবে :
ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও দাম উল্লেখ করে রসিদ দিতে হবে এবং প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।
বিপিসি আরও বলেছে, ডিলাররা বরাদ্দ ও ভোক্তার ক্রয়ের রসিদ গ্রহণ করে তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ্য ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল গ্রহণ করবে।
ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুতের তথ্য পর্যালোচনা করে সরবরাহ করা হবে এবং কোনো অবস্থায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে বিপিসি।
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক :
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।গতকাল সংস্থাটির পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটি জানানো হয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গুজব ও অপপ্রচারের কারণে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। তাই গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিপিসি জানায়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে নিয়মিত আমদানি অব্যাহত রয়েছে এবং বিভিন্ন ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পাম্পগুলোতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে তেল বিক্রির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিপিসি আরও জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা মজুত করে রাখার চেষ্টা করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
জ্বালানি তেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই :
দীর্ঘমেয়াদে যাতে দেশে জ্বালানির সংকট না হয়, সে জন্য আগামী রোববার থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা পেট্রোল পাম্পগুলোকে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। গতকাল পরীবাগের পেট্রোল পাম্প পরিদর্শন শেষে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন,‘যে সংশয়টি জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে, আমরা সেটিকে অস্বাভাবিকভাবে দেখছি না। কারণ একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ফলে একটি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি আশ্বস্ত করতে চাই, জ্বালানি তেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের কাছে যথেষ্ট মজুত রয়েছে।’
তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে আমরা কয়েক গুণ বেশি তেল সরবরাহ দিয়েছি। ক্রেতারা স্বীকার করেছেন, তারা বেশি করে তেল নিচ্ছেন। এ আতঙ্ক দূর করতে হবে। জনগণের দুর্ভোগ কমানোর জন্য সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এটি একটি চাপ তৈরি করছে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সমন্বয়ে যেতে হবে। আমরা চেষ্টা করব দাম না বাড়াতে। তবে একান্তই না পারলে তখন জনগণের সঙ্গে আমরা তা শেয়ার করব। পাশাপাশি আমরা দেশবাসীর সমর্থন কামনা করছি।
ফিলিং স্টেশনে লম্বা লাইন, হচ্ছে হাতাহাতিও :
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গতকাল ছুটির দিনেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পরীবাগ স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের কয়েক দফা তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
পরীবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার সময় ভিড় দেখা যায়। এ স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এ লাইনের কারণে ছুটির দিনেও এ সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ ৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছেন উবার চালক নাজমুল হাসান। তিনি জানান, শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রায় ৫০ মিনিট পর তেল নিতে পেরেছেন। এ সময়ে তিনি দু-তিনটি ভাড়া পেতে পারতেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের অল্প হলেও চলে, কিন্তু এই তেল ছাড়া তাদের চলবে না।
তেল শেষ হয়ে গেলে কী হবে, সেটি নিয়েও চিন্তিত এই মোটরসাইকেলচালক। কারণ উবার চালিয়েই চলে তার সংসার। তবে এই ফিলিং স্টেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক আহমেদ রুশদ বলেন, তাদের তেলের মজুতে কোনো ঘাটতি নেই। ক্রেতারা যেমন চাইছেন, তেমনই তেল দিচ্ছেন তারা। মানুষ কিছুটা আতঙ্কিত হলেও ফিলিং স্টেশনে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
তেল পাচার রোধে সীমান্তে বিজিবির বাড়তি সতর্কতা :
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে মজুত থাকা তেল যাতে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যেতে না পারে, সে জন্য দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সরকারের নির্দেশে গত বৃহস্পতিবার থেকে হিলি সীমান্তে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিজিবির পক্ষ থেকে অতিরিক্ত টহল চালানো হচ্ছে।
জয়পুরহাট ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল লতিফুল বারী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সীমান্তে বিজিবির বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে তেলের পাচার রোধে বিজিবির পোস্টগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া আমদানি করা পণ্য নিয়ে আসা ভারতীয় ট্রাকগুলো দেশে ফেরার সময় তল্লাশি করা হচ্ছে। বিজিবি নিশ্চিত করেছে, কোনোভাবেই তেল পাচার হয়ে যেতে দেওয়া হবে না এবং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকবে।
বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতি নেই, সংকটের কথা অতিরঞ্জিত :
বিশ্ববাজারে তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং সংকটের আশঙ্কা অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল। স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এ দাবি করেন তিনি।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ‘লজিস্টিক্যাল বিঘ্ন’ অনেক দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে পর্যাপ্ত ও বিশাল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তেল রয়েছে। জরুরি মজুত তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়টি আইইএ বিবেচনা করছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব ধরনের বিকল্পই টেবিলে রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।
বিরোল আরও বলেন, আমরা মূলত সাময়িক একটি বিঘ্নের মুখে পড়েছি; এটি একটি লজিস্টিক্যাল বিঘ্ন।
কেকে/এলএ