চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনের আগে দলটির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের সামনে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন’সহ একগুচ্ছ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা হয়েছিল, তেমনি বিরোধী মহলে ঠাট্টা-বিদ্রুপও কম হয়নি।
সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বলা যায়— ভোটের দিনের ‘হাতের কালি’ এখনো পুরোপুরি শুকায়নি; সরকার গঠনের এক মাসও পূর্ণ হয়নি— এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনি অঙ্গীকারের বাস্তব রূপ দিতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ভাতা চালু করা হয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ১৬ মার্চ দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন’ কর্মসূচি উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে। আর বাংলা নববর্ষের দিন ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে ‘কৃষক কার্ড’। অল্প সময়ের মধ্যে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সূচনা অনেককেই বিস্মিত করেছে, এমনকি কট্টর বিরোধীদের মুখেও প্রশংসা দেখা দিয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড : নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। দেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এ উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করবে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এমন বহু পরিবার রয়েছে, যারা সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতার বাইরে ছিল। বিভিন্ন সময়ে নানা কর্মসূচি চালু হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সীমাবদ্ধ ছিল রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে। ফলে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগটি সেই সীমাবদ্ধতা দূর করার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ কার্ডের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক সহায়তা প্রদান করা হবে, যা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষদের খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সুবিধা ও জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সহজ ও দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী : বাংলাদেশ বহু ধর্মের মানুষের মিলিত আবাসভূমি। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষ এখানে দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বসবাস করছে। সমাজে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক সংহতি রক্ষায় ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকার ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা চালু করেছে। এর আওতায় শুধু মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনই নয়, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার পাদ্রি এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ উদ্যোগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের ইতিবাচক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
কৃষক কার্ড : বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি। গ্রামবাংলার অসংখ্য কৃষকের পরিশ্রমের ফলেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। সেই কৃষকদের জন্য সরকার চালু করতে যাচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’। বর্তমানে প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের আটটি বিভাগের দশটি উপজেলার নির্দিষ্ট ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ১৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, কৃষি ঋণ, বীজ ও সার সহায়তা এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের অভিযোগ— বিভিন্ন সরকারি সুবিধা অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। কৃষক কার্ড চালু হলে সেই সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাল পুনঃখনন : সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো খাল পুনঃখনন কর্মসূচি। আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খননের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে খাল-বিল ও জলাধারের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু গত কয়েক দশকে দখল ও ভরাটের কারণে অসংখ্য খাল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর ফলে সেচব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন, কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়।
রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা : এ কল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোর পেছনে একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের সূচনা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিএনপি গঠন করেন। তার শাসনামলে গ্রামবাংলার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনগণের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে সেই ধারাকে আরও শক্তভাবে এগিয়ে নিয়েছেন দলটির প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গণতন্ত্র রক্ষা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তার নেতৃত্বে বিএনপি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। আজকের এসব উদ্যোগ সেই রাজনৈতিক ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা বহন করে, যেখানে জনগণের কল্যাণকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কোনো সরকারের সফলতা শুধু নীতি ঘোষণা বা কর্মসূচি উদ্বোধনের ওপর নির্ভর করে না। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। এখানেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকর্মীদের ওপর এসে পড়ে। যদি কোনো পর্যায়ে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বা পক্ষপাতিত্ব দেখা দেয়, তাহলে একটি ভালো উদ্যোগও মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। তাই যারা এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা— চোখ ও কান খোলা রাখুন। জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কোনো অনিয়ম দ্রুতই জনসমক্ষে চলে আসে। প্রকৃত মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
রাজনীতিতে আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু সেই আস্থা ধরে রাখা আরও কঠিন। নতুন সরকার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এ উদ্যোগগুলো সফল করতে হলে প্রয়োজন সততা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা। যদি ফ্যামিলি কার্ড প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়, যদি ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী নিয়মিতভাবে দেওয়া হয়, যদি কৃষক কার্ড সত্যিকারের কৃষকের হাতে পৌঁছে এবং যদি খাল পুনঃখনন প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি এ সরকারের শুধু সাফল্য হবে না; পুরো জাতির কাছে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
কারণ, বাংলাদেশের মানুষ সবসময় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা চায়। তারা এমন একটি সরকার দেখতে চায়, যারা শুধু কথা বলে না, কাজও করে। সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই নেওয়া উদ্যোগগুলো সেই প্রত্যাশার একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা। এখন প্রয়োজন এই পথকে আরও সুদৃঢ় করা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি ঘোষিত কর্মসূচিগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে এসব উদ্যোগ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, খোলা কাগজ
কেকে/এলএ