বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক নতুন অনিশ্চয়তার মানচিত্রে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির ত্রিমুখী চাপে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাত সরাসরি জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ এবং ইউক্রেন গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বড় সরবরাহকারী। যুদ্ধের ফলে এ দুই দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপর। এদিকে যুদ্ধের প্রভাব কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ‘ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ’ ঘিরে আঞ্চলিক অস্থিরতা বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ায় এই অঞ্চলের যে কোনো সংঘাত বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দামে দ্রুত প্রভাব ফেলে। এ ধরনের সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, বন্দর এবং পরিবহন রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। এতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ে। ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নৌপথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খনিজ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এ প্রণালিকে প্রায়ই বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ‘গলা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। জাহাজ চলাচলের পথ পরিবর্তন, উচ্চ বিমা ব্যয় এবং বন্দরগুলোতে কন্টেইনার জটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে বিলম্ব ঘটে। ফলে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের সময় এবং খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
এর প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন খাত এবং সাধারণ বাজারে। এই পরিস্থিতিতে অনেক দেশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্থানীয় উৎপাদনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একইসঙ্গে মূদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো (ফেডারেল রিজার্ভ, বাংলাদেশ ব্যাংক) সুদহার বৃদ্ধি করছে, ফলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে।
এতে করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়তে পারে। এর ফলে জাতীয় বাজেটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি জ্বালানি ও ডলারের দাম বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের দামে। উচ্চ আমদানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে এবং এতে মুদ্রার মানও কমে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অনেক দেশ সুদের হার বাড়ানো, ভর্তুকি প্রদান এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো নীতি গ্রহণ করছে। তবে এসব পদক্ষেপ সবসময় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না। বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি যেহেতু এক ধরনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ধীর বা শিথিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে। তাই জ্বালানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এবং শিল্পে চাপ তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হয়ে গেছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে উত্তেজনা কমলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে, তবে তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া সহজ নয়। বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও আপাতত স্থিতিস্থাপকতা, নীতি সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে ডলারের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সতর্কতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক বা বৈশ্বিক অস্থিরতা সরাসরি দেশের বাজারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। যাতে সংকটের সময় সাধারণ মানুষ এবং দেশীয় অর্থনীতি উভয়ই সুরক্ষিত থাকে।
সবশেষে বলা যায়, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং যুদ্ধ এ তিনটি উপাদান মিলেই বর্তমান বিশ্বের নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্র তৈরি করছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে প্রতিটি দেশকে তাদের অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও টেকসই ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস