দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর। আর এই উৎসবকে ঘিরে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নামে বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন আর লঞ্চঘাটগুলোতে। কিন্তু প্রতিবছরই এই আনন্দের আবহে বিষাদের ছায়া ফেলে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা আর রাষ্ট্রিয় অব্যবস্থাপনা। এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক, নৌ ও আকাশপথের প্রতিকূলতার পাশাপাশি প্রচণ্ড গরম একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নিরাপদ ঈদযাত্রার জন্য ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই হয়ে ভ্রমণ। বাসের ছাদ, ট্রেনের ইঞ্জিন কিংবা লঞ্চের উপচেপড়া ভিড় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অথচ একটু সচেতন হলেই আমরা এই অনাকাক্সিক্ষত বিপদ এড়াতে পারি। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ যাত্রাপথ অত্যন্ত ধকলের। এই সময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সর্দি-জ্বর কিংবা পেটের পীড়া দেখা দিতে পারে। তাই অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম (ফার্স্ট এইড বক্স) সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এবারের ঈদযাত্রায় আরেকটি বড় ঘাতক হতে পারে তীব্র তাপপ্রবাহ বা ‘হিট স্ট্রোক’। গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ যানবাহনে আটকে থাকা অবস্থায় শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি এবং খাবার স্যালাইন সঙ্গে রাখা জীবন রক্ষাকারী হতে পারে। পথের ধারের খোলা খাবার বা পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকা কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকিই কমাবে না, বরং ‘অজ্ঞান পার্টি’ বা ‘মলম পার্টি’র মতো অপরাধী চক্রের হাত থেকেও আমাদের সুরক্ষা দেবে।
পাশাপাশি, যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হাঁপানি) ভুগছেন, তাদের জন্য ইনসুলিন, ইনহেলার এবং নিয়মিত ওষুধ সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক। গর্ভাবস্থার প্রথম ও শেষ তিন মাস ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাড়াহুড়ো করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত করে আমরা যেন প্রিয়জনের ঈদের আনন্দকে বিষাদে পরিণত না করি।
ঈদ এলেই দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে এক ধরনের অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হবে এটা স্বাভাবিক। দীর্ঘ যানজট, টিকিট সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া, লঞ্চঘাটে বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনার আশঙ্কা কিংবা প্রতারণার ঘটনা, সব মিলিয়ে অনেক সময় ঈদযাত্রা ঘরমুখো মানুষের জন্য দুঃসহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা বাস, কোথাও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলা যানবাহন, আবার কোথাও অজ্ঞানকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারান যাত্রী।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় ঈদযাত্রার দুর্ভোগ কি অবশ্যম্ভাবী, নাকি সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব? ফলে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো ঈদকে ঘিরে যে বিশাল জনস্রোত তৈরি হয়, তা কেবল একটি উৎসব উপলক্ষে মানুষের ভ্রমণ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের পরিবহন ব্যবস্থাপনার সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। ফলে সড়ক ও নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ৯৯৯-এর মতো জরুরি সেবাকে সচল ও তৎপর রাখতে হবে। ঈদের আনন্দ কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোতে নয়, বরং সুস্থ ও নিরাপদে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার মধ্যে নিহিত। আমাদের সচেতনতাই পারে একটি দুর্ঘটনামুক্ত, স্বাস্থ্যঝুঁকিহীন এবং আনন্দঘন ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে। সকলের ঈদযাত্রা হোক আনন্দময় ও নিরাপদ এই প্রত্যাশা রইল।
কেকে/এলএ