দৌলতদিয়ায় যেভাবে বাসটি তলিয়ে যাবার ঘটনা ঘটেছে তা কোনো “দুর্ঘটনা” নয়—এটা ছিলো একেবারে প্রতিরোধ করা সম্ভব এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় বারবার ব্রেক ধরতে গিয়ে ব্রেক ফেইল করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। মুহূর্তেই ঝরে যায় দুই ডজনের বেশি প্রাণ। পদ্মার গভীর পানিতে হারিয়ে যায় জীবন্ত মানুষগুলো, উদ্ধার করা হয় লাশ। হারিয়ে যায় অনেকগুলো পরিবার, অনেকগুলো মানুষের ভবিষ্যৎ। যারা বাস থেকে কোনভাবে বেরিয়ে সাতার কেটে বেঁচে গেছে, তারা বলছে—সবকিছু ঘটেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। ফেরিতে উঠানামার ছোট সরু রাস্তায় একটা ছোট ভুল, আর তারপর বাসটি পন্টুন দিয়ে চলে গেল নদীতে এরপর শুধু পানি আর চিৎকার।
কিন্তু এই দৃশ্য আমাদের দেশে নতুন না। আমরা বারবার এই একই ঘটনার সম্মুখীন হই, একই খবর বারবার পড়ি, একইভাবে মানুষ মরতে দেখি, তারপর আবার সব আগের মতো অন্য কোন দুর্ঘটনা ঘটার মাধ্যমে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
বাংলাদেশে ফেরি ও নৌ দুর্ঘটনার চিত্রটা ভয়াবহ এবং দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশকে শত শত দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ নদীতে যাত্রাপথে প্রাণ হারিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মৃতের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। আবার সামগ্রিক নৌ দুর্ঘটনায় মৃত্যু কয়েক হাজারেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়।
প্রায় প্রতি বছরই বহু মানুষ যাত্রাপথে ফেরি, লঞ্চে ওঠা বা নামার সময়ও ডুবে মারা যায়। অনেক ঘটনা আবার ঠিকভাবে নথিভুক্তই হয় না বা মিডিয়ায় সেইভাবে কভারেজ হয় না। অর্থাৎ আমরা যে সংখ্যাটা দেখি, বাস্তবে তা আরও বেশি। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর পেছনে কারণও নতুন কিছু না—বাসে, ফেরিতে, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী। পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ এবং যাত্রী ও গাড়ি পারাপারের জন্য পুরনো আমলের ফেরি। ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা, চরম উদাসীনতা এবং অব্যবস্থাপনার সাথে দুর্বল তদারকি—সব মিলিয়ে এদেশের ফেরি পারাপারে এক ধরনের বিপজ্জনক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘাটের ফেরিতে উঠানামার রাস্তার চরম করুন অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্র। অনেক জায়গায় ফেরিতে ওঠার রাস্তা এখনো কাঁচা, পিচ্ছিল, আধাপাকা, ভাংগাচোরা, অমসৃন ও এবড়ো-খেবড়ো। বড় বাসগুলো ও লোড করা বড় ট্রাকগুলোকে নদীর একেবারে কিনারা ঘেঁষে ঘুরে পন্টুন দিয়ে টার্ন দিয়ে বামে অথবা ডানে বাক নিয়ে ফেরিতে গিয়ে উঠতে হয়। একটুখানি ভুল কিংবা এক সেকেন্ডের অসতর্কতা মানেই সরাসরি নদীতে পড়ে যাওয়া। রাত হলে এই ঝুঁকি আরও বহুগুন বেড়ে যায়। কিন্তু রাতেই দুরপাল্লার গাড়িগুলো বেশি চলাচল করে।
সবচেয়ে অদ্ভুত এবং ভয়ংকর বিষয় হলো—যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে। বাস ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীদের নামানো হয় না কিংবা বললেও বেশিরভাগ যাত্রীরা নামে না, দরজা বন্ধ রাখা হয়, জানালার মাঝখানে লম্বা লোহার পাইপ ব্যবহার করা হয়, কার আগে কে উঠবে বা নামবে এই প্রতিযোগিতায় পুরো বাসটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। প্রায়ই ঘটছে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা।
আন্তর্জাতিকভাবে এটা সম্পূর্ণ অনিরাপদ পারাপারের পদ্ধতি। কিন্তু এই দেশে ফেরিঘাটগুলোতে এটিই যেন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে গেছে। ফেরির ভেতরের অবস্থা আরও হতাশাজনক ও আশঙ্কাজনক। অস্বাস্থ্যকর নোংরা, ধুলো ময়লা, তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ, ব্যবহার অনুপযোগী ওয়াশরুম—সবকিছুর মাঝেও মানুষজন নিরুপায় হয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এইসব ফেরি দিয়ে যাত্রা করে। কেউ চা-কফি খাচ্ছে, কেউ খাবার খাচ্ছে, কেউ সিগারেট খাচ্ছে কিন্তু চারপাশে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি নেই। এটা শুধু ভোগান্তি কিংবা অস্বস্তি না, এটা এদেশের সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের এক ধরনের অবহেলা।
দেশে ফেরি ও নৌ ব্যবস্থাপনা আইন আছে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ নেই। নৌ পরিবহন সংক্রান্ত আইনগুলোতে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, মনিটরিং, পরিদর্শন, লাইসেন্স—সবকিছুই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর খুব কমই মানা হয়। তদারকি দুর্বল, জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে।
এভাবে আর কত? আর কত পরিবার নদীর পানিতে হারিয়ে যাবে? আর কত অনাকাঙ্ক্ষিত অকালমৃত্যুতে আমরা প্রিয়জনকে হারাবো। আর কত মা সন্তানের জন্য অপেক্ষা করবে, আর কত সন্তান বাবা মায়ের জন্য অপেক্ষা করবে অথচ তারা আর কখনো ফিরবে না?
সরকারের কাছে এখন এদেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের একটাই আকুতি—এই মৃত্যুগুলোকে স্বাভাবিক ঘটনা ভাবা বন্ধ করুন, এগুলো হত্যা। পুরনো ফেরি ও নৌযানগুলো বদলান, ঘাটের ওঠানামার রাস্তাগুলো অতিদ্রুত ঠিক করুন, নিরাপত্তা নিয়ম কঠোরভাবে চালু করুন এবং প্রয়োগ করে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দিন। কারণ এই দেশ নদীর, আর এই নদী পার হওয়াটা কোনো লটারির মত জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হতে পারে না। মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায়—এটা কোনো বিলাসিতা না, এটা তাদের ন্যায্য নাগরিক অধিকার।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, ডীন—ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেকে/এলএ