জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক সংকট। এ সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে চলছে বির্তক। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় নিয়ে দেখা দিয়েছে মতবিরোধ।
এরমধ্যে গণভোটে থাকা কয়েকটি বিষয় বাস্তবায়নে নারাজ সরকারি দল বিএনপি। যদিও এসব বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকেও দলটির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া আছে। অপরদিকে জুলাই সনদ ও গণভোটে থাকা সবগুলো বিষয় বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট।
এমনকি গণভোটের রায় ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ গড়াচ্ছে রাজপথে। ইতোমধ্যে গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আজ (শনিবার) বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
এদিকে গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ও ঐকমত্য কমিশনের ভূমিকা ‘প্রতারণাপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তার মতে, জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে চলমান সংকটের পেছনে দায়ী হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার ও ঐকমত্য কমিশন। তারা কৌশলে গণভোটে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকা বিষয়গুলোকে একটি পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। যা খুবই নিঁচু মানের চালাকি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
সম্প্রতি একটি ভিডিওতে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এর পেছনে এক ধরনের নিঁচু মানের চালাকি রয়েছে। যার ফলে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে, অন্যথায় এ সংকট দেখা দিত না।’
ঘাড় ধরে কাউকে নিজের কোনো আইডিয়া চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থেকে এটি করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, গণভোটে ‘গ’ এবং ‘ঘ’-তে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে; এগুলো থাকলেই যথেষ্ট হতো। কিন্তু এখানে বাজে, নোংরা চালাকি করা হয়েছে। গণভোটের ব্যালটে থাকা ‘ক’ এবং ‘খ’-তে এমন কিছু বিষয় আনা হয়েছে, যার অনেকটিতে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। যার মাধ্যমে এক ধরনের চালাকি করা হয়েছে, যাতে ঘাড় ধরে বিএনপির ওপর এসব চাপিয়ে দেওয়া যায়। আর এ কাজটি বর্তমান বিরোধী দলের যোগসাজশে করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, সংবিধান সংস্কারে দেশের জনগণ জুলাই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার না করে তাদের পছন্দমতো কিছু বিষয় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি জনরায়কে উপেক্ষা করা। এ কারণে ন্যায্য দাবি আদায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি দিতে ৭ এপ্রিল বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।
তবে সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ অস্তিত্বহীন। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এজন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হবে। রোববারের মধ্যেই গঠন করা হবে এ কমিটি।
এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণভোট আয়োজন করেছে, বৃহস্পতিবার সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ অবস্থায় গণভোট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া ছাড়াও বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে। কেউ কেউ এও বলছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলে পুরো গণভোট অবৈধ হয়ে যাবে।
এরইমধ্যে ৩ মার্চ গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ফলে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে এক ধরনের আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। এতে সবকিছু মিলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এমনটিই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেন, গণভোট অধ্যাদেশটি বাতিলের জন্য সংসদীয় কমিটি সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। এখন অধ্যাদেশটি ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, শুরুতেই অধ্যাদেশটি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কারণ, এতে এমন কিছু আছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি এ অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না।
তবে ব্যারিস্টার আহসানুল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশের মানে হলো এটি আর আইনে রূপ নেবে না। তবে গণভোট অধ্যাদেশটি আইনে রূপ না নিলেও গণভোট বাতিল হবে না। কারণ, ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে গণভোট হয়ে গেছে। আর এটি আইনে রূপ নেওয়ার মানে হলো ভবিষ্যতে এই আইনের মাধ্যমে মানুষের জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কিন্তু সেটির আর প্রয়োজন নেই।
প্রসঙ্গত, জুলাই জতীয় সনদ বাস্তবায়নে ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অধিবেশন ডাকা হয়নি।
এ কারণে সংসদের বাইরেও রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে বিরোধী দল। এবারের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। অর্থাৎ, ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা আদেশে বলা নেই। এতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়তো আদালতের মাধ্যমে সুরাহা হতে হবে।
কেকে/ এমএস