যদিও ইউক্রেন এবং ইরানের যুদ্ধের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হতে পারে, তবে হোয়াইট হাউস থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পহেলা এপ্রিলের (এপ্রিল ফুলস ডে) ভাষণ এই সাদৃশ্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। নিশ্চিতভাবেই, ইউক্রেন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র (তা যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন), যে রাষ্ট্রটি ইউরোপীয় উইনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বাসনা পোষণ করে এবং রাষ্ট্রটি তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়।
অন্যদিকে ১৯৭৯ সালে ইরান ইসলামিক রেভুলিউশনের মাধ্যমে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে সেখানে চলছে ইসলামি শরিয়া শাসন। নাগরিকদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর রয়েছে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্র। মতপ্রকাশ ও গণ মাধ্যমের ওপর রয়েছে সেন্সরশিপ। বিভিন্ন সময় ইরানের স্বাধীনতাকামী জনগণকে নানাভাবে নিপীড়িত হতে হয়েছে। ফলে ইরান এবং ইউক্রেনের পরিস্থিতিকে একই রকম বলা চলে না।
দেশ দুটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। ইরানের সরকার রাশিয়ার স্বৈরাচারী সরকারকে ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে এবং বিনিময়ে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে পাচ্ছে গোয়েন্দা সহায়তা, আর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা এ দুটি দেশই তেল বিক্রি করছে চীনের কাছে। বিপরীতে, ইউক্রেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা এবং ইউরোপ ও অন্যান্য গণতন্ত্রের কাছ থেকে অর্থ ও অস্ত্র পাচ্ছে।
কিন্তু এ নৈতিক এবং কৌশলগত দিকগুলোর বাইরে তাকালে কিছু চমকপ্রদ সাদৃশ্য আমরা দেখতে পাই। তাদের মধ্যে প্রধান হলো সেই নেতাদের চরিত্র যারা এ যুদ্ধগুলো শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন উভয়ই এ সংঘাত কীভাবে এগোবে তা নিয়ে ভুল হিসাব করেছিলেন এবং প্রত্যেকেই এখন নিজের তৈরি করা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোনোভাবে মুখরক্ষার উপায় খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ফলস্বরূপ, পারস্য উপসাগরে ‘শান্তি’র জন্য ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ১৫ দফার আমেরিকান পরিকল্পনাটি অনেকটা ক্রেমলিনের ২৮ দফার ইউক্রেন ‘শান্তি’ পরিকল্পনার মতোই শোনায়, যা গত বছর ট্রাম্পের শৌখিন কূটনীতিক জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। উভয় নথি, সেইসঙ্গে ট্রাম্পের পহেলা এপ্রিলের অসংলগ্ন ভাষণকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত কিন্তু আক্ষরিকভাবে নয়। এগুলো যা ইঙ্গিত দেয় তা হলো একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খোঁজার চেষ্টা।
অবশ্যই, প্রতিটি প্রস্তাবই অপর পক্ষ থেকে দ্রুত প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যালিস্টিক-মিসাইল কর্মসূচি ত্যাগ করবে না এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে কারা যাতায়াত করতে পারবে এবং কত মূল্যে পারবে তা নির্ধারণ করার মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছ থেকে চরম প্রতিশোধ নিতে তারা বদ্ধপরিকর।
আর ইউক্রেন, বোধগম্য কারণেই, পুতিনের আঞ্চলিক আগ্রাসনের পুরস্কার হিসেবে দনবাস অঞ্চলকে ছেড়ে দেবে না। পরিবর্তে, ইউক্রেনীয়রা তাদের মাটি আঁকড়ে ধরে রাখতে এবং রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে চরম ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলে (যা এখন ভিয়েতনামে মার্কিন ক্ষতির চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি) তাদের প্রতিহত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আকাশপথে ভারী বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও, ইউক্রেন বা ইরান কেউই তাদের শত্রুকে সহজ প্রস্থানের সুযোগ দিয়ে আপস করার তাড়াহুড়া করছে না।
যদিও ইউক্রেন এবং ইরানের মধ্যে কোনো নৈতিক সমতা নেই, তবে যুদ্ধের কৌশলের মধ্যে কিছু কৌতূহল উদ্দীপক মিল রয়েছে। উভয় যুদ্ধই অত্যন্ত আশাবাদী অনুমানের ভিত্তিতে শুরু করা হয়েছিল। পুতিন আশা করেছিলেন কয়েক দিনের মধ্যে কিয়েভ দখল করবেন; রুশ সেনাদের এমনকি আসন্ন বিজয় উদযাপনের জন্য তাদের প্যারেড ইউনিফর্ম সঙ্গে আনতে বলা হয়েছিল। ইউক্রেনীয় সরকারকে ক্রেমলিনের একটি পুতুল সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার পরিকল্পনা ছিল।
একইভাবে, ট্রাম্প ধরে নিয়েছিলেন যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানে তাৎক্ষণিক শাসন পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে। তিনি ভেবেছিলেন শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে তিনি আয়াতুল্লাহ এবং ইরানি রেভুল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে ভয় দেখিয়ে বশ করতে পারবেন। তিনিও ভেবেছিলেন ভেনেজুয়েলার মতো আমেরিকার ইচ্ছা পালনের জন্য সেখানে একটি পুতুল সরকার বসিয়ে দেবেন।
উভয় পরিকল্পনা যে কতটা কাল্পনিক ছিল তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। ইউক্রেন স্বাধীন থাকার জন্য অনুপ্রাণিত ছিল এবং ২০১৪ সালের তুলনায় (যখন তারা রাশিয়ার কাছে ক্রিমিয়া হারিয়েছিল) অনেক বেশি প্রস্তুত ও সুসজ্জিত ছিল। একইভাবে, ইরানের জটিল, যুদ্ধ-কঠিন এবং কট্টরপন্থি ক্ষমতা কাঠামো কখনোই ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীর মতো আচরণ করত না।
প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি এটা নয় যে, এ পরিকল্পনার কোনোটি যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারত কি না (অবশ্যই পারত না)। প্রশ্ন হলো কেন প্রতিটি আগ্রাসী পক্ষ এত মারাত্মকভাবে ভুল করেছিল? কেন ট্রাম্প এবং পুতিন বুঝতে বা অনুমান করতে পারেননি যে অনেক ছোট সেনাবাহিনীও অসম যুদ্ধের মাধ্যমে জবাব দেবে? এটি স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল যে, একটি রাষ্ট্র যখন অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সে তার সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
তা ছাড়া আক্রান্ত দুই দেশই জানত কী করতে হবে। চার বছর ধরে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন এবং ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে আসছিল এবং লক্ষ্য করছিল কীভাবে ইউক্রেন আকাশপথ ও সমুদ্রপথের ড্রোন ব্যবহার করে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার জাহাজ ধ্বংস করছে এবং রাশিয়ার তেল ও গ্যাস অবকাঠামো তছনছ করছে। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস কেবল একই শিক্ষা হরমুজ এবং পারস্য উপসাগরে প্রয়োগ করেছে, যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা হয়েছে এবং আমেরিকার ওপর চাপ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবুও ট্রাম্পকে অপ্রস্তুত বলে মনে হয়েছে। তিনি জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানের পরামর্শ উপেক্ষা করেছেন এবং হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরানের কাছে সম্ভবত আমেরিকার পুরোনো ধাঁচের ইন্টারসেপ্টরের তুলনায় দশ গুণ বেশি নতুন প্রজন্মের হালকা ড্রোন ছিল এবং প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে ওই ড্রোনের চেয়ে দশ গুণ বেশি খরচ হয়।
২০২২ সালেও একই রকম কিছু ঘটেছিল। পুতিন এবং তার জেনারেলরা কোনোভাবে অনুমান করতে পারেননি যে, কিয়েভ অভিমুখী একটি একক রাস্তায় ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া যানের দীর্ঘ বহরকে রাজধানীর উত্তরে একটি মাত্র সেতু উড়িয়ে দিয়ে সহজেই আটকে দেওয়া এবং ধ্বংস করা সম্ভব।
এই বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তগুলো একটি গভীর ব্যাধির লক্ষণ। একজন ব্যক্তি একা একটি পুরো দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে না যদি না সেই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই ভেঙে পড়ে। ট্রাম্প এবং পুতিন উভয়ই একদল তোষামোদকারীর ওপর নির্ভর করেছিলেন যারা কখনোই তাদের কাজের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করত না।
ক্রেমলিনের একজন বৃদ্ধ, বিচ্ছিন্ন একনায়ক কেন বাস্তবতার প্রতি অন্ধ হয়ে পড়বেন তা বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেভাবে তার নিজস্ব সামরিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করতে পারেন এবং কংগ্রেস বা আমেরিকান জনগণের সঙ্গে আলোচনা না করে, এমনকি দীর্ঘদিনের মিত্রদের না জানিয়েই একটি বড় যুদ্ধ শুরু করতে পারেন, তা আমেরিকার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার গভীরতাকেই উন্মোচিত করে।
পুতিন এবং ট্রাম্প অবশ্যই আলাদা। তবে ব্যক্তিত্বের জায়গা থেকে তাদের দুজনের মধ্যে রয়েছে বেশ মিল, দুজনের মধ্যেই রয়েছে সহমর্মিতার অভাব, অবলীলায় মিথ্যা বলার ক্ষমতা, ন্যায়-অন্যায়ের প্রতি উদাসীনতা এবং অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হলে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা। যুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রে তারা একই ধরনের ভুল করেছেন। যদি ইরানের সঙ্গে এ যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী মন্দার দিকে নিয়ে যায়, তবে আমেরিকার অভ্যন্তরে যে গণতান্ত্রিক সংকট রয়েছে সেটিই হবে তার মূল কারণ।
লেখক : ইতালির প্রভাবশালী দৈনিক কোরিয়েরে ডেলা সেরার সম্পাদকীয় পর্ষদের অন্যতম প্রধান সদস্য
অনুবাদ: ফরহাদ নাইয়া
কেকে/ এমএস