মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জ্বালানি সংকট সমাধানে বহুমুখী উৎসের সন্ধানের বিকল্প নাই
মো. মফিজুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:১৪ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

ক্রমেই তীব্র হচ্ছে জ্বালানি সংকট। জ্বালানি তেল কেনার আশায় দীর্ঘ সারিতে অনেকেই অপেক্ষায় থাকছেন মধ্যরাত থেকে। তেলের অভাবে নগরবাসীর কর্মজীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি অতিষ্ঠ হচ্ছে জনজীবন। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি আর সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। আগামী পাঁচ বছরের স্থিতিশীল শাসনের পথ প্রশস্ত করতে হলে এই মুহূর্তে জ্বালানি খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট ও নিরাপত্তা নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তার মতো ইস্যু নিয়ে বিগত সরকারগুলোর সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচির বড় ধরনের ঘাটতি ধরা পড়ছে। অর্থপাচারের কারণে এমনিতেই দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থায় জ্বালানি মূল্যের উল্লম্ফন এবং অনিশ্চয়তা সামষ্টিক অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা ভর করেছে। জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। বিদ্যুৎ, গণপরিবহন, শিল্প-কারখানা, রফতানি বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জ্বালানির সহজলভ্যতা ও অবাধ প্রবাহের উপর নির্ভরশীল।  

তেলের ব্যবহারের ইতিহাস শুরু হয় প্রাকৃতিক তেল ফোটা এবং বিটুমেন দিয়ে প্রাচীন সময়ে, তবে আধুনিক তেল শুরু হয় এডউইন ড্রেকের প্রথম বাণিজ্যিক কূপ খননের সাথে, পেনসিলভেনিয়ায় ১৮৫৯ সালে। গ্যাসোলিন দ্রুত পরিবহন ও শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু ১৯৭৩, ১৯৭৯ ও ২০২৬ সালের তেলের সংকটগুলো দেখিয়েছে যে, তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটা নাজুক। বাংলাদেশে তেল সংকটের কারণে এখন গুরুতর পরিস্থিতি, কারণ দেশটি প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানি করে, যা বিদেশি জোগানে খুব বেশি নির্ভরশীল। সরকার বর্তমানে জরুরি তেল আমদানি, জ্বালানি রেশনিং ও ভবিষ্যতের জন্য আমদানির চুক্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। দীর্ঘমেয়াদে, জ্বালানি আমদানি কমাতে স্থানীয় পরিশোধন, বিকল্প জ্বালানি যেমন সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

কাস্টমসের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানির চাহিদা প্রায় প্রায় ৭০ লাখ টন। সৌদি আরব, আমিরাত, ওমান, কুয়েত, ইরাক, কাতার ছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। গত ১৪ মাসে বাংলাদেশ ২০ দশমিক ৬৯ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে, ৬৩ শতাংশ বা ১৩ লাখ টন সরবরাহ করেছে সৌদি আরব, আমিরাত ও ইরাক। একক দেশ হিসেবে সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি ৭ দশমিক ১০ লাখ টন তেল আমদানি করা হয়েছে।

আরব আমিরাত থেকে ৩০ শতাংশ বা ৬ দশমিক ২০ লাখ টন আমদানি করা হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা আমদানির ওপর নির্ভরতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। তা সত্ত্বেও কেন পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের জন্য কিলোমিটার জুড়ে লাইন লাগছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজেলের অভাব থাকলেও পেট্রোল-অকটেনের এই হাহাকার সম্পূর্ণভাবেই কৃত্রিম এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের প্রাণ কৃষিখাতে। বর্তমানে বোরো ধানের দানা গঠনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় চলছে, যখন জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া অপরিহার্য। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে সেচ পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন প্রান্তিক কৃষকরা। অনেক জায়গায় পাম্প মালিকরা কৃষকদের মাত্র ১০ লিটার করে ডিজেল দিচ্ছেন, যা দিয়ে বিঘার পর বিঘা জমির সেচ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের প্রধান রফতানি খাত, তা-ও এখন জেনারেটর চালানোর ডিজেল সংকটে ধুঁকছে। শিল্প মালিকরা আশঙ্কা করছেন যে, যদি তেলের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হয় তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দেওয়া সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করা যাবে না, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধাক্কা দেবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও তেলের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিনির্ভর। ইরান যুদ্ধের প্রলয়ংকরী প্রভাবে পারস্য উপসাগরের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। 

জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে তিনটি ক্রুড অয়েলের চালান আটকা পড়ে আছে, যার ফলে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি কাঁচামাল সংকটে পড়েছে। মার্চের শেষ দিকে এই শোধনাগারের মজুত মাত্র ৩০ হাজার মেট্রিক টনে নেমে এসেছিল, যা দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় মাত্র এক সপ্তাহ চলা সম্ভব। 

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়বে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এবং বাংলাদেশ এখনো তা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘদিন এই চাপ বহন করা সরকারের জন্য সম্ভব নয়।

এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি তেল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে ৫টিই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের। এগুলো হলো- সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান ও কুয়েত। ২০২৩ সালে এই ৫টি দেশ প্রতিদিন ২৬ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা বিশ্বের মোট দৈনিক উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগ।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে নতুন কর্মকৌশল নিয়েছে সরকার। এর আওতায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত ৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান সংঘাতে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে প্রভাব; পরিস্থিতি মোকাবিলায় গৃহীত কর্মকৌশল (স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি); অর্থায়ন কৌশল-সংবলিত অর্থ বিভাগের প্রণীত কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। 

বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রণীত সমন্বিত কর্মকৌশলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান, সারের উৎপাদন, মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। 

আগামী ৩ মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গৃহীত কর্মকৌশল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংকিং সেবা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। জরুরিসেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে।  

জ্বালানি সংকট সমাধানে জ্বালানি খাতের বহুমুখী উৎসের সন্ধান, বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস ব্যবহারের দিকে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় তেল-গ্যাস খাতের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। ভারত-মিয়ানমার, পাকিস্তান ও চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক ফ্রেমওয়ার্ক গঠনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা সামগ্রিক অর্থনীতি, স্থিতিশীল উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। চলমান সংকটকে সামনে রেখে এ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে স্বল্প মেয়াদি ও টেকসই দীর্ঘ মেয়াদি কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জ্বালানি সংকট সমাধান   বহুমুখী উৎসের সন্ধান   মো. মফিজুর রহমান  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close