সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকান বন্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ীরা অকার্যকর ও ক্ষতিকর হিসেবে দেখছেন। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নেওয়া এ পদক্ষেপ বাস্তবে সমস্যার সমাধান না করে নতুন সংকট তৈরি করছে বলেই তাদের দাবি। শুরুতে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও আপত্তির মুখে তা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সাতটা করা হয়, কিন্তু এটিকে ব্যবসায়ীরা শুধু প্রতীকী সমন্বয় হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের খুচরা বাজারব্যবস্থা মূলত সন্ধ্যাকেন্দ্রিক। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, গরম আবহাওয়া এবং যানজটের কারণে অধিকাংশ মানুষ দিনের শেষে কেনাকাটা করেন। ধারণা করা হয়, মোট খুচরা বিক্রয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই সন্ধ্যার পর হয়। ফলে দোকান খোলার সময় কমিয়ে দিলে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
এ সিদ্ধান্ত কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ খুচরা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত, যাদের একটি বড় অংশ খণ্ডকালীন কর্মী। তারা সাধারণত সন্ধ্যার শিফটে কাজ করেন। দোকানের সময়সীমা কমে গেলে তাদের আয়ও কমে যাবে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দিক থেকেও এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। খুচরা খাতে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ মাত্র ৩ শতাংশের মতো, আর পুরো বাণিজ্যিক খাত মিলিয়েও তা ৮-১০ শতাংশের বেশি নয়। তাই দোকান আগেভাগে বন্ধ করিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তার প্রভাব খুবই সীমিত হতে পারে।
এ ছাড়া রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। খুচরা বাণিজ্য থেকে সরকার নিয়মিত ভ্যাট পায়। দোকানের সময় কমে গেলে ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
ভোক্তাদের আচরণেও পরিবর্তন আসছে। জ্বালানি সংকট ও পরিবহন সমস্যার কারণে মানুষের ব্যয় আগেই কমে গেছে। এর মধ্যে সীমিত সময়ের কারণে আসন্ন বড় কেনাকাটার মৌসুমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খল ও সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে বিকল্প সমাধান রয়েছে। ব্যবসায়ীরা দুপুর ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বিদ্যুতের চাপের সময় এড়ানো যায়। পাশাপাশি এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্র ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সার্বিকভাবে, জ্বালানি সাশ্রয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিবেচনায় করা প্রয়োজন। একতরফা সময়সীমা নির্ধারণের বদলে কার্যকর ও টেকসই সমাধানই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
কেকে/ এমএস