মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নোবেল কি দেশকে নো-বল স্টাইলে শাসালেন
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৫১ এএম

ইতিহাসের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের ভাবতে হচ্ছে, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া এক জনপদকে মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যিনি মসনদে বসেন, তিনি কি শেষ পর্যন্ত দেশের ইনিংসটাকে ‘নো-বল’ আর ‘ফ্রি-হিটের’ মহড়ায় পরিণত করলেন?  জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে গণমানুষের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া, কিন্তু বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ দেখা যাচ্ছে শুধু আত্মতুষ্টির এক বিশাল স্তূপ। তথাকথিত ‘দেশের স্বার্থে’র বুলি আউড়ে যখন তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের হাল ধরলেন, তখন সাধারণ মানুষের চোখে ছিল এক বুক প্রত্যাশা। 

ড. মুহাম্মদ ইউনুস নোবেলজয়ী সেই নাম, যাকে ঘিরে মানুষ ভেবেছিল এক জাদুকরী পরিবর্তনের কথা; নবনির্বাচিত সরকার যখন ক্ষমতার চাবি হাতে নিল, তারা দেখল রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি কলকব্জা মরিচা ধরা এবং স্থবির। তার শাসনামলের রেখে যাওয়া ক্ষতগুলো আজ দেশের অর্থনীতি আর প্রশাসনকে এমনভাবে ধুঁকতে বাধ্য করছে, যা কাটিয়ে ওঠা এখন হিমালয় জয়ে নামার মতোই দুঃসাধ্য এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার বারান্দায় যখন আপনজনদের ভিড় বাড়ে, তখন সাধারণের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ হয়ে যায়। 

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সাবেক এই প্রধান উপদেষ্টা কীভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে ‘গ্রামীণ’ বলয়ের অনুগতদের বসিয়ে এক পকেট উপদেষ্টা গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন, যারা রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি সচেষ্ট ছিল। আইনের শাসন যখন ব্যক্তির ইশারায় চলে, তখন ন্যায়বিচার নির্বাসনে যায়। নিজের বিরুদ্ধে থাকা সাত-সাতটি মামলার ঘানি থেকে তড়িঘড়ি করে অব্যাহতির যে আইনি মারপ্যাঁচ তিনি সাজিয়েছিলেন, তা নৈতিকতার বিচারে এক কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পুরো দেশটাকে যেন তিনি তার ব্যক্তিগত এনজিওর আদলে সাজাতে চেয়েছিলেন। 

‘গ্রামীণময়’ রাষ্ট্র গড়ার সেই সূক্ষ্ম পায়তারা সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করে এক বিশেষ কর্পোরেট ধাঁচের দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় মত্ত ছিল। রাজপথ যখন বিচারের নামে মবের হাতে চলে যায়, তখন সভ্যতার পরাজয় ঘটে। তার শাসনামলে ‘মবের মুল্লুক’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই জনপদে আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে গণপিটুনি আর উশৃঙ্খলতাই যেন অলিখিত সংবিধানে পরিণত হয়েছিল। 

গুরু-শিষ্যের যে পবিত্র সম্পর্ক হাজার বছরের বাংলার ঐতিহ্য, তা ধূলিসাৎ হতে আমরা দেখেছি অবলীলায়। ছাত্রদের হাতে সম্মানিত শিক্ষকদের লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিটি দৃশ্য ছিল জাতির বিবেককে চাবুক মারার মতো যন্ত্রণাদায়ক, যার দায়ভার তৎকালীন প্রশাসন এড়াতে পারে না। ঢাকা শহর হয়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত ‘দাবির নগরী’। অনৈতিক আর অযৌক্তিক সব আশ্বাসের আড়ালে জনজীবনকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল, যেখানে সড়কের শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কক্ষ সবই ছিল স্লোগানের দখলে। শিক্ষার মানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যখন ‘পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়ার’ মতো অহেতুক দাবিগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য। 

সস্তায় জনপ্রিয়তা পাওয়ার এ মানসিকতা আমাদের মেধা-কাঠামোকে তিলে তিলে ধ্বংস করেছে। সরকারি লাল ফিতার দৌরাত্ম্য অন্য সবার জন্য থাকলেও, নিজের ব্যক্তিগত প্রজেক্ট ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ অনুমোদনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিদ্যুদ্বেগ। রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের চেয়েও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ফাইল এখানে দ্রুততম সময়ে ছাড় পেয়েছে। করের বোঝা যখন সাধারণ মানুষের পিঠ বাঁকিয়ে দেয়, তখন ‘গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্ট’ উপভোগ করেছে বিশেষ রাজকীয় কর মওকুফ সুবিধা। জনস্বার্থের কথা বলা শাসকের এমন দ্বিচারিতা সাধারণ করদাতাদের সাথে এক নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

নিজের প্রতিষ্ঠানের ‘সমাধান সার্ভিসেস’ নামে ই-ওয়ালেটের লাইসেন্স প্রাপ্তি ছিল এক পরিকল্পিত নীল নকশার অংশ। ডিজিটাল লেনদেনের বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে নিজের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভ্যাট যেখানে রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস, সেখানে ‘গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন’কে বিশেষ ভ্যাট সুবিধা দিয়ে রাজকোষকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটি কি শুধু সুবিধা, নাকি জনগণের পকেট থেকে সরাসরি নিজের তহবিলে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার বৈধ পন্থা?

নিজের কোম্পানির জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স আর ‘বায়রা’র সদস্যপদ অর্জনের ক্ষেত্রে যে দ্রুততা দেখানো হয়েছে, তা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। যেখানে সাধারণ ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর ঘুরছে, সেখানে ক্ষমতার ছোঁয়ায় সব বাধাই যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। অব্যবস্থাপনার বিষবাষ্প যখন স্বাস্থ্য খাতে ছড়ায়, তখন বলি হয় নিস্পাপ শিশুরা। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে যখন শিশু মৃত্যুর খবর শিরোনাম হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে প্রশাসনের মনোযোগ জনস্বাস্থ্যে নয়, বরং অন্য কোথাও নিবদ্ধ ছিল। 

চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বিদায় নেওয়ার পরিবর্তে নতুন আঙ্গিকে ফিরে এসেছিল তার আমলে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে একদল নব্য চাঁদাবাজ যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তখন সরকার যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিল।  খোদ ২০২৫ সালেই ১৭৩টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৭৯ জনের এবং আহত হয়েছেন ১৫৮ জন।  

নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে আনুগত্য আর ব্যক্তিগত সম্পর্কই ছিল মূল মাপকাঠি। ফলে সচিবালয় হয়ে উঠেছিল এক বিশেষ গোষ্ঠীর আখড়া, যেখানে রাষ্ট্রের নথিপত্র ডিল হতো ড্রয়িংরুমের আড্ডার মতো।

বিচার ব্যবস্থাকে পঙ্গু করার এক অস্ত্র ছিল ‘জামিন বন্ধ’। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বা ভিন্নমতকে দমন করতে জামিন পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারকে যেভাবে খর্ব করা হয়েছে, তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। জনগণের সামনে জবাবদিহিতার ভয় কি তার ছিল? সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন নিয়ে অপেক্ষা করতেন, তখন প্রধান উপদেষ্টার আড়ালে থাকার প্রবণতা প্রমাণ করে যে তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে কতটা অস্বস্তি বোধ করতেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গল্প বলা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ভুয়া মামলায় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার আর মাসের পর মাস জামিন না হওয়া ছিল এক ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টির অপপ্রয়াস, যা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে লম্বা ভাষণ দিলেও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ ছিল নগ্ন। নিজের বা পছন্দের ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষায় বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগগুলো আজ গুমরে কাঁদছে। বৈদেশিক ঋণের পাহাড় জমিয়ে দেশকে এক দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই ঋণের অর্থ কোথায় খরচ হলো বা কার পকেটে গেল, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব আজ জনগণের কাছে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে পুলিশকে করা হয়েছিল অকার্যকর। ফলে অপরাধীরা রাজত্ব করেছে বুক ফুলিয়ে, আর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার অভাবে প্রতিটি মুহূর্ত কাটিয়েছে চরম আতঙ্কে। 

অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো শিল্প খাত, কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে তার শাসনামলে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পথে বসেছে, অথচ ড. ইউনূস ব্যস্ত ছিলেন তার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পালিশ করতে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ‘চাপাবাজি’ চললেও মাঠপর্যায়ে ফলাফল ছিল শূন্য। একজন রোহিঙ্গাকেও সফলভাবে প্রত্যাবাসন করতে না পারা তার কূটনৈতিক ব্যর্থতার এক বিশাল দলিল হয়ে আছে। ‘রিসেট বাটন’ চাপার দোহাই দিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার যে ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে, তা কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিক মেনে নিতে পারে না। 

ইতিহাসের পাতাকে মুছে ফেলে নতুন আখ্যান তৈরির এই চেষ্টা ছিল আত্মঘাতী। বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তিনি বজায় রেখেছিলেন এক অসম শক্তির ভারসাম্য, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে বিদেশের মনোরঞ্জনই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। অরাজনৈতিক সাজার আড়ালে তিনি যে ‘অতি রাজনীতি’র চর্চা করেছেন, তা সংবিধানবহির্ভূত গণভোট অধ্যাদেশ আর রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়ের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট। পরিশেষে বলা যায়, নোবেলজয়ী হিসেবে যে সম্মানের আসনে তিনি ছিলেন, শাসনের নামে ‘নো-বল’ খেলে তিনি নিজেকে সেই উচ্চতা থেকে শুধু নিচে নামিয়েছেন, দেশকে উপহার দিয়েছেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক
  
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close