এসেছে পহেলা বৈশাখ, নববর্ষ। সুপ্রভাত ১৪৩৩। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ হিসেবে পালনের রেওয়াজ মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে। আরবি বা হিজরি চান্দ্রবর্ষের সৌরবর্ষ সংস্করণ হলো বাংলা সন। তারপর থেকে বছরের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ চৈত্রকে চৈত্রসংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ হিসেবে সাড়ম্বরে পালন করা হয়। নববর্ষ পালন মানব সভ্যতারই অনুষঙ্গ।
পহেলা বৈশাখ শুধু সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতিরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আদিতে পহেলা বৈশাখের উৎসব খাজনা আদায়বিষয়ক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তা পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক দেনা-পাওনার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিচিত্র ও বহুমুখী ধারায় প্রবাহিত হয়। শুধু দোকানে বকেয়া আদায়ের হালখাতা নয়; ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের মতো পহেলা বৈশাখেও পোশাকের সঙ্গে বসতঘর ও কর্মক্ষেত্র সাজানোর আয়োজন হয়।
রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র বিপণিবিতান ও শপিংমলে পহেলা বৈশাখ এনেছে বৈচিত্র্য। বর্ষবরণে লাল, সাদা, সবুজ পাঞ্জাবি এবং শাড়ির সঙ্গে রয়েছে বাহারি সব পোশাক।
একই সময়ে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে উদযাপিত হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈসাবি—বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু উৎসব। পাহাড়েও প্রাণোচ্ছল এ উৎসব শুরু হয়েছে। সেখানে শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্করা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নদীতে ফুল ভাসিয়ে গত বছরের গ্লানি দূর করে নতুন বছরের শান্তি কামনা করেন। তাদের উৎসবের তাৎপর্যও আমরা গভীরভাবে অনুধাবন করি।
প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই আমাদের সংকল্প থাকে, সমৃদ্ধ, উন্নত ও গর্বিত বাংলাদেশ গঠনের পথ যেন নির্বিঘ্ন হয়। উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা, প্রগতিশীলতার ধারায় আমাদের পথচলা উল্লেখযোগ্য। আমাদের প্রত্যাশা, পহেলা বৈশাখ জাগ্রত করবে শান্তি ও সম্প্রীতির চেতনা। ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার অন্তরে বাংলা নববর্ষ নতুন করে দোলা দিক।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আকাঙ্ক্ষা করেছেন নতুন বছরে—
“অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”
এ চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা অন্যান্য পহেলা বৈশাখের মতো আজও মত-পথ নির্বিশেষে সব বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সব ধর্মের মানুষের মিলনের উৎসব বাংলা নববর্ষ। পহেলা বৈশাখের এ মহিমা অটুট থাকুক। ধর্মীয় সংকীর্ণতা আর সাম্প্রদায়িকতার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সবাই মাতুক উৎসবের আনন্দে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। জীর্ণ-ঝরা পাতার মতো পুরোনো বছর শেষে ঝরে পড়বে সব অন্ধকার। সম্প্রীতি ও শান্তি নতুন বছরে সবুজ পাতার মতো অঙ্কুরিত হবে আমাদের জীবনের সর্বস্তরে।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা পাড়ের মানুষও হাজার হাজার বছর ধরে বর্ষবরণ পালন করে আসছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার দিনপঞ্জি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু হলেও গ্রামীণ সমাজে বাংলা বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। কালের বিবর্তনে গ্রামীণ সমাজেও গ্রেগরীয় দিনপঞ্জির ব্যবহার বেড়েছে। তারপরও কৃষক সমাজ আজও বাংলা সনকে সামনে রেখে তাদের ফসলি কার্যক্রম চালায়। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও হালখাতার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষকে চিরঞ্জীব করে রেখেছে।
বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা। নববর্ষের বৈশাখী মেলা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাঙালির নববর্ষ আসে কালবৈশাখীর ঝড়ো হাওয়ার মাতম তুলে। জরাজীর্ণ যা কিছু তাকে উড়িয়ে দিয়ে নববর্ষে নতুনের অভিষেক হয়। নববর্ষে বাঙালি অতীতের দুঃখ-বঞ্চনা-ব্যর্থতা ভুলে সামনে এগোনোর শপথ নেয়।
নববর্ষ বরণের সংস্কৃতি চিরন্তন, সর্বব্যাপী। সব দেশ, সব জনগোষ্ঠী নিজ নিজ নতুন বছরে এভাবেই মেতে ওঠে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। বাংলা নববর্ষেও একই রীতি চলে আসছে হাজার বছর ধরে। বৈশাখী মেলা, উৎসবের আয়োজন, হালখাতা তৈরি, মিষ্টান্ন বিতরণ, ভালো ভালো খাবার পরিবেশন—এসব বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্যেরই অংশ। এ একটি দিনে বাংলার মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—কারও মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। নববর্ষের উৎসব হয়ে ওঠে সর্বজনীন।
বৈশাখ মানে গ্রীষ্ম ঋতুর শুরু। উজ্জ্বল রৌদ্রময় দিন, আবার কখনও কালবৈশাখীর বজ্র-বিদ্যুৎসহ ভয়াল রূপ। জীবনসংগ্রামের দীক্ষা লাভের নানা রূপের সংমিশ্রণ নববর্ষের সূচনালগ্ন। এ সূচনালগ্নে নতুন ভাবনা-চিন্তায় কতটা এগিয়েছি আমরা, তারও মূল্যায়ন করা দরকার। নতুন বছরে পদার্পণের অর্থই হলো নতুনের মুখোমুখি হওয়া, সামনের দিনগুলোকে নব উদ্যমে বিনির্মাণের তাগিদ। আমাদের উদ্যম, আমাদের অধ্যবসায় সবই নিয়োজিত হোক জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে।
বাংলা নববর্ষ সুর-সংগীতের, মেলা-মিলনের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সংকল্পের প্রেরণা জোগায়। দুঃখ-গ্লানি ও অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার দিনও পহেলা বৈশাখ। দেশ ও জাতির কল্যাণে সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে এগিয়ে যাওয়ার অগ্নিশপথ নেওয়ার দিন এটি। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বৈশাখের চেতনায় উজ্জীবিত হোক সবাই। নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে সবাই হোক উদীপ্ত।
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ—সবখানেই রয়েছে পহেলা বৈশাখের হার না মানা প্রত্যয়। নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন সংস্কৃতির বাহন বলে বিবেচিত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। হালখাতা, বৈশাখী মেলা এবং শহুরে পান্তা-ইলিশের রমরমা—আধুনিকতার এই যুগেও নিজেদের বাঙালি হিসেবে ভাবার সুযোগ করে দেয়। শুভ নববর্ষে বিদায়ী বছরের জীর্ণ, পুরাতন, বিষাদঘন স্মৃতি ভেসে যাক। ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে প্রাণে প্রাণে লাগুক শুভকল্যাণের দোলা—“নবআনন্দ বাজুক প্রাণে”।
পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ আধুনিকতার এ যুগেও আমাদের বাঙালি হিসেবে ভাবার সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশসহ দুনিয়ার সব প্রান্তে বসবাসরত বাঙালিকে। নতুন বছরে প্রতিটি মানুষ নতুন প্রত্যয়ে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার শপথ নেয়। অতীতের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠে নিজেকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বুক বাঁধে। জাতীয় জীবনেও অভিন্ন প্রত্যয়ে আমরা যাতে এগিয়ে যেতে পারি—এ দিনে তেমন শপথই নেওয়া উচিত।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
কেকে/এলএ