ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত। বিশেষ করে সীমান্তের শূন্যরেখা বরাবর মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। আর এতেই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। মাইন বিস্ফোরণে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন; পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই। এ ছাড়া সীমান্তের ওপর থেকে প্রায়শই গুলি, মর্টার শেল এসে বাংলাদেশ সীমান্তে পড়ছে। এতেও ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
জানা গেছে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের ২২০ কিলোমিটারে মাইন বিস্ফোরণে এসব ঘটনা ঘটেছে। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ঘটনা বেশি ঘটেছে। খেতে কাজ করতে গিয়ে আবার কখনো গরু-ছাগল আনতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে পা হারান তারা।
মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে বাংলাদেশের তরফ থেকে একাধিকবার প্রতিবাদ জানানো হলেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। জানা গেছে, ভূমিমাইনে বিশ্বে যেসব দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মিয়ানমার।
১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তি হয়। ভূমিমাইন তৈরি, ব্যবহার ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই চুক্তিতে। তবে যেসব দেশ এই চুক্তিতে সই করেনি, মিয়ানমার তাদের মধ্যে একটি।
সর্বশেষ কক্সবাজারের উখিয়ায় নাফ নদীর শূন্যরেখায় মাইন বিস্ফোরণে এক রোহিঙ্গা যুবকের ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার পালংখালী সীমান্তে নাফ নদীর শূন্যরেখায় জেগে ওঠা চর চাকমাকাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আহত যুবকের নাম মো. ইউনুছ (২৫)। তিনি উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৯) ডি-২ ব্লকের সবুল আহমদের ছেলে। বিজিবি ও স্থানীয় জেলেদের সূত্রে জানা গেছে, ইউনুছ এলাকাটিতে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন। আহত অবস্থায় স্থানীয় জেলেরা তাকে উদ্ধার করে উখিয়ার এমএসএফ হাসপাতালে পাঠান। পরে সেখান থেকে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ ঠেকাতে দুই বছর ধরে নাফ নদীতে জেগে ওঠা চরসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। কয়েক মাস ধরে স্থলমাইন বিস্ফোরণে লোকজন বেশি আহত হচ্ছেন, এর বেশিরভাগই রোহিঙ্গা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, সম্প্রতি উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে খাদ্যসহায়তা কমিয়ে আনা হয়েছে। তাই অর্থসংকটে পড়ে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয়শিবির থেকে বেরিয়ে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে নাফ নদীতে নামছে। তারাই বেশি মাইন বিস্ফোরণে আহত হচ্ছে।
এর আগে ১০ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উখিয়ার বালুখালী সীমান্তসংলগ্ন নাফ নদীর শূন্যরেখার নারিকেলবাগান এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে মো. সাদেক নামের এক রোহিঙ্গা আহত হন। ২৯ মার্চ দুপুরে উখিয়া সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল হাকিম (১৫) নামের এক কিশোরের ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এর কয়েক দিন আগে একই উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে নাফ নদীর শূন্যরেখায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে শহীদুল ইসলাম (২৫) নামের আরেক রোহিঙ্গা যুবক গুরুতর আহত হন। তারও একটি পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়।
এর আগে গত ৭ মার্চ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার (৫৩) নামের এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নিচের অংশটি উড়ে গেছে। আহত আবদুল জব্বার উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নের পাইনছড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি পেশায় কাঠুরিয়া।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোছড়ি ইউনিয়নের পাইনছড়া গ্রামটি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। গতকাল এ এলাকার সাত থেকে আটজন কাঠুরিয়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঠ কাটতে গিয়েছিলেন। এ সময় শূন্যরেখার কাছে একটি মাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যায়।
২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে অন্তত ৬৩ জন মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের, পা হারিয়েছেন ৪৮ জন। বাকিদেরও বিভিন্ন অঙ্গহানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ ও ২০২৪ সালে। ২০২৪ সালে ১০ জন এবং গত বছর ১৮ জন হতাহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তের দুই পাশের বাসিন্দাদের অনেকেই নানা কাজকর্মে বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করেন। গাছ কাটা, গরু চরানো, কৃষিকাজ, মাছ ধরাসহ নানা কারণে মানুষ সীমান্ত পার হন।
এ ছাড়া সীমান্তে পণ্য চোরাচালানের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত রয়েছেন, যারা নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করেন। এসব মানুষই মূলত সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছেন। বর্তমানে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বেশিরভাগ এলাকাতেই মাইন পোঁতা রয়েছে। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সঙ্গে থাকা সীমান্তে মাইন স্থাপন করা হয়েছে বেশি। সামান্য অসতর্ক হলেই মাইনের ফাঁদে হতাহত হচ্ছেন মানুষ।
মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে শিশু নিহত :
গত ১১ জানুয়ারি সকালে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয় হুজাইফা সুলতানা আফনান নামের এক শিশু। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৭ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়।
কেকে/ এমএস