বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসন দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ‘নীরব বণ্টনের’ জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। বাইরে থেকে গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকলেও ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত হতো সীমিত পরিসরে, নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যে। কিন্তু এবার বিএনপি যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, তা সেই পুরোনো ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। এটি কেবল একটি প্রক্রিয়া পরিবর্তন নয় বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে নতুন মানসিকতার সূচনা।
মনোনয়ন উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি এখানেই বড় হয়ে ওঠে। এতে তৃণমূলের কর্মী, ছাত্ররাজনীতির সক্রিয় সদস্য, এমনকি দীর্ঘদিনের নীরব সমর্থকরাও সামনে আসার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে প্রতিযোগিতা হয়েছে বাস্তব, অংশগ্রহণ হয়েছে বিস্তৃত।
এরপর ধাপে ধাপে যে ফিল্টার বসানো হয়েছে—জামানত বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক সিভি, ব্যক্তিগত ও আর্থিক স্বচ্ছতার ঘোষণা—এসব প্রক্রিয়াকে শুধু কঠিনই করেনি বরং অর্থবহ করেছে। এখানে শুধু উপস্থিতি নয়, যোগ্যতাই হয়ে উঠেছে মূল বিষয়।
সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল সরাসরি ভাইভা। শত শত প্রার্থীকে বোর্ডের সামনে নিজের রাজনৈতিক যাত্রা, ত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। এটি অনেকের জন্য অপ্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে এটি রাজনীতিকে জবাবদিহির পথে নিয়ে যাওয়ার একটি শক্তিশালী ধাপ। কারণ এখানে পরিচয় নয়, কথা বলার সক্ষমতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পেয়েছে। যারা মাঠে থেকেছেন, মামলা-হামলার মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের গল্পই এখানে মূল্য পেয়েছে। এই প্রক্রিয়া বিএনপির ভেতরে একটি বার্তা স্পষ্ট করেছে—দলের জন্য কাজ করলে তার মূল্যায়ন একদিন না একদিন হবেই। এটি ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করছে। একই সঙ্গে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড গড়ে দিচ্ছে, যেখানে নেতৃত্ব আসবে সংগ্রাম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, শুধু মনোনয়নের মাধ্যমে নয়।
অন্যদিকে, এই পুরো উদ্যোগটি দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জন্য এক ধরনের অস্বস্তিকর আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটি খুব সরল—কেন তারা পারে নাই বা পারে না বা পারছে না? কেন এখনও অনেক দলে সংরক্ষিত নারী আসন মানেই কেন্দ্রের পছন্দের কয়েকটি সিলেক্টেড নাম? কেন তৃণমূলের কর্মীরা সেই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ থাকা এখন আর সহজ হবে না। বরং জনগণের মধ্যেও ধীরে ধীরে এই প্রত্যাশা তৈরি হবে যে, প্রতিটি দলকেই স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে প্রার্থী বাছাই করতে হবে।
সত্য কথা হলো, এমন উদ্যোগ রাজনৈতিক ঝুঁকিমুক্ত নয়। এতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগে, পুরোনো অভ্যাস ভাঙতে হয়। কিন্তু তবুও বিএনপি যে পথে হাঁটা শুরু করেছে, তা সাহসী এবং সময়োপযোগী। এটি যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তাহলে সংরক্ষিত নারী আসন আর কোনো ‘দেওয়া পদ’ থাকবে না বরং হয়ে উঠবে ‘অর্জিত সম্মান’। আর ঠিক সেখানেই এই পরিবর্তনের আসল গুরুত্ব—এটি শুধু প্রার্থী বাছাই নয়, রাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবার একটি দরজা খুলে দিয়েছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, ডীন—ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেকে/ এলএ