সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার নানাবিধ সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্ড যেমন কৃষি কার্ড, হেলথ কার্ড, এবং ফ্যামিলি কার্ড এর পাইলট প্রজেক্ট শুরু করেছে। উক্ত প্রজেক্টগুলোর মূল্যায়নে নানাবিধ আলোচনাও শুরু হয়েছে। আমরা বেশকিছু সূচক নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি, যার সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি, এবং রিজার্ভ নিয়েও বেশকিছু আলোচনা শুরু হয়েছে।
টেলিভিশনের টকশো, নীতিনির্ধারণী বৈঠক কিংবা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে এই আলোচনাগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। যদিও একটি মৌলিক প্রশ্ন অনুচ্চারিত থেকে যাচ্ছে। তা হলো, এই সংখ্যাগুলো কি মানুষের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারছে কিনা। কারণ অর্থনীতির উন্নয়ন এর প্রকৃত চেহারা কেবল পরিসংখ্যানে ধরা পড়লে চলবে না; তা ধরা পড়তে হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মান উন্নতির বাস্তবতায়।
যেমন, মাস শেষে একটি পরিবার ধার করছে কি না, সন্তানের স্কুলের ফি সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে কি না, হঠাৎ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ জোগানো সম্ভব হচ্ছে কি না, এসব সূক্ষ্ম বাস্তবতার মধ্যেই অন্য আরও ফ্যাক্টের সঙ্গে একটি দেশের সুষম অর্থনীতির ভিত্তি নির্মিত হয়। যাহোক, টেকনোলজি সংক্রান্ত আলোচনার বাইরে গিয়ে আমার আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকারের কার্ডভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার কতটা কাছের।
এই প্রশ্নের আঙ্গিকে ফ্যামিলি কার্ড ও কার্ডভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগগুলোকে নতুন দিক থেকে দেখা প্রয়োজন। অনেকেই বিষয়টিকে সরলভাবে দেখেন, সরকার কার্ড প্রদান করছে, কিছু সহায়তা দিচ্ছে, এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যাবে, এটি কেবল সহায়তা নয়; এটি রাষ্ট্রের চিন্তাভাবনার এবং মানুষের সম্পৃক্ততার একটি মৌলিক পরিবর্তন। এর প্রধান দিকটি হচ্ছে, বর্তমান সরকার একটি দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত ও আংশিক তথ্যনির্ভর সরকার ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত, সুসংগঠিত কাঠামোয় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা করছে। আমরা হয়ত অনেকেই বিষয়টি বিবেচনা করতে ভুল করছি।
আমি আরও গভীরভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোতে পরিবার শুধু সামাজিক বন্ধনের জায়গা নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ইউনিট, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। বলা যেতে পারে, একজন মানুষের আয় তার ব্যক্তিগত সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তা পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।
একজন কর্মজীবী ব্যক্তি তার নিজের খরচের পাশাপাশি সন্তানের শিক্ষা, বয়স্ক পিতামাতার চিকিৎসা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, বাজার খরচ ও সবকিছুর ভার বহন করেন। ফলে কোনো একটি স্বল্প আয়ের ধাক্কা পুরো পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় উন্নয়নকে যদি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে দেখা হয়, তাহলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, দেখতে হবে ফ্যামিলির ওপর দৃষ্টি দিয়ে।
বলা যায় যে, ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য কার্ড ব্যবস্থার উদ্যোগ এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র, যেখানে পরিবারকে একটি পূর্ণাঙ্গ একক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যেমন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, খাদ্য সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তিসহ আরও নানা ধরনের উদ্যোগ বহু বছর ধরেই চালু রয়েছে। কিন্তু এখানে একটি বড় সমস্যা খুবই প্রকটভাবে প্রতীয়মান, আর তা হলো এসব কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি।
একটি পরিবার একাধিক উৎস থেকে সুবিধা পাচ্ছে বা সরকার দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সব সাহায্য দরকার এমন প্রত্যেক পরিবার কি সহায়তা পাচ্ছে? উত্তর হচ্ছে, না, এমন চিত্র খুবই পরিচিত। এর ফলে একদিকে যেমন সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ও ঘটেছে। ফ্যামিলি কার্ড এই সমস্যার একটি কাঠামোগত সমাধানের চেষ্টা যা বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে জাতির সামনে এনেছেন।
ফ্যামিলি কার্ড ব্যাবস্থার মাধ্যামে পরিবারভিত্তিক একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির দ্বার উন্মোচন করেছে যখন একটি পরিবারের সামগ্রিক অবস্থার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া শুধু এক মুহূর্তের ব্যাপার, তখন সহায়তা আর অনুমাননির্ভর থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে তথ্যনির্ভর ও লক্ষ্যভিত্তিক।
এখানেই আসে টার্গেটিং-এর মতো বিষয়টি, যা উন্নয়নের একটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। সহজভাবে বললে, টার্গেটিং মানে সঠিক মানুষের কাছে সঠিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এই জায়গাটিতেই ঘাটতি ছিল। গ্রামীণ বাস্তবতায় প্রায়ই শোনা যায়, ‘আমার নাম তালিকায় নেই, কিন্তু পাশের বাড়ির লোক সব সুবিধা পায়’। এই অভিযোগ কেবল ব্যক্তিগত হতাশা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি এই ত্রুটিগুলো কমানো যায়, এবং আমি মনেকরি তা সম্ভব, তাহলে সেটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। কারণ এতে শুধু সহায়তার পরিমাণ নয়, সহায়তার ন্যায্যতাও নিশ্চিত হবে। আর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক আস্থা তৈরি হয়, যা একটি অর্থনীতির জন্য অদৃশ্য হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করবে।
বর্তমানে দেশের বাস্তবতায় অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কয়েক হাজার টাকা বা সীমিত খাদ্য সহায়তা দিয়ে আদৌ কী বড় পরিবর্তন সম্ভব? এই প্রশ্নটি স্বাভাবিক, কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের ধারণার চেয়ে ভিন্ন। একটি পরিবার যদি নিয়মিত সামান্য সহায়তা পায়, তাহলে তারা ধার কম নেয়, খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ে, হঠাৎ কোনো বিপর্যয়ে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতির যে ক্ষেত্রটি তৈরি হয় তা হলো, তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা পরিকল্পনা করতে পারে।
এখন এই একই পরিবর্তন যদি লক্ষ লক্ষ পরিবারের মধ্যে ঘটে, তাহলে সেটি আর ছোট থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রবাহ। এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় বাজারের বাস্তবতায়। একটি পরিবার সহায়তা পেয়ে যে কোনো বাজারে যায়, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করে থাকে। পণ্য ক্রয়ের সেই অর্থ দোকানদার হয়ে পাইকার, এবং পাইকার হয়ে উৎপাদকের কাছে গিয়ে পৌঁছায়, যা তাকে আরোও পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করে। এই পুরো ব্যবসার প্রক্রিয়াটি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখে।
অর্থাৎ, ফ্যামিলি কার্ড কেবল দরিদ্রের সহায়তা নয়, বরং এটি ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় বাজার এবং উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও একটি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। একটু সহজভাবে বললে, এই কার্ড শুধু একটি পরিবারের জীবনকে সহজ করে না, উপরন্তু এটি একটি গ্রামীণ অর্থনৈতিক শৃঙ্খলকে সচল রাখে।
বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে একটি ডিজিটাল রাষ্ট্রের দিকে এগোচ্ছে, এবং এই যাত্রায় তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা যায়, তাহলে সরকার প্রথমবারের মতো দেশের একটি বাস্তবসম্মত চিত্র পাবে। কোথায় দারিদ্র্য বেশি, কোথায় স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি, কোথায় শিক্ষা সহায়তা প্রয়োজন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখন অনুমানের ওপর নির্ভর করবে না, তা নির্ভর করবে তথ্যের ওপর।
এতে নীতিনির্ধারণ শুধু দ্রুতই হবে না, তা হবে আরও কার্যকর এবং বাস্তবমুখী। অবশ্যই, এই ধরনের একটি বড় উদ্যোগ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকবে। তালিকা প্রণয়নে ত্রুটি, তথ্য হালনাগাদের সমস্যা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, এসব প্রশ্ন উঠতেই পারে। কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রভাব বা অপব্যবহারের আশঙ্কাও প্রকাশ করবেন। এসব উদ্বেগকে একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, কোনো ব্যবস্থাই শুরু থেকেই নিখুঁত হয় না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি সঠিক দিকনির্দেশনা থাকা এবং সেই দিক ধরে এগিয়ে যাওয়া। যদি অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকে, যদি তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়, এবং যদি স্বচ্ছতা বজায় রাখা যায়, তাহলে এই সীমাবদ্ধতাগুলো ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন। রাজনীতি কেবল বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে না। যখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তব নীতিতে রূপ নেয়, তখনই তার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়।
ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ দেখায় যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং একটি সুসংগঠিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরও গভীর। একটি পরিবার যখন কিছুটা নিরাপত্তা পায়, তখন তারা সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে পারে, স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হয়, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের পরিকল্পনার সাহায্য করতে পারে বা কান্ট্রিবিউশন করতে পারে। এই ছোট ছোট জায়গাগুলো বা সিদ্ধান্তগুলো এক সময় একটি দক্ষ, সুস্থ এবং উৎপাদনশীল জনশক্তি তৈরির সহায়ক শক্তি তৈরি করে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখছেন, তার মূলে রয়েছে দেশের আর্থসামাজিক অবকাঠামোর পুনর্বাসন। সেই লক্ষ্য অর্জনে এই ফ্যামিলি কার্ড প্রজেক্ট বাস্তবায়ন প্রকল্প কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি সুশাসনের একটি নতুন ব্যবস্থাপনার অংশ। এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে একটি নিষ্ক্রিয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামো থেকে একটি সক্রিয়, চটপটে এবং জনবান্ধব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার শক্তি রাখে, যেখানে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফ্যামিলি কার্ড হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া, যেখানে উন্নয়নকে আরও মানবিক, আরও সামাজিক লক্ষ্যভিত্তিক এবং আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থনীতির বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় খুব নীরবে শুরু হয়, একটি পরিবারের স্বস্তি থেকে, একটি শিশুর নিয়মিত স্কুলে যাওয়া থেকে, একটি মায়ের নিশ্চিন্ত ঘুম থেকে। এই শিশুটি যখন একজন সুশিক্ষিত সফল প্রফেশনাল বা ব্যবসার উৎপাদকতা হয়ে দেশের অর্থনীতির বড় পরিবর্তন আনবে তখন ফলাফল আসবে।
বাংলাদেশ আজ সেই নীরব পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। এই পথ নিঃসন্দেহে সহজ নয়, এবং চ্যালেঞ্জও কম নয়। কিন্তু যদি দিকটি সঠিক থাকে, যদি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, এবং যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই উদ্যোগ একসময় দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক কাঠামোতে একটি গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তখন হয়তো আমরা বুঝতে পারব, অর্থনীতির বড় রূপান্তর আসলে শুরু হয়েছিল খুব ছোট একটি জায়গা থেকে, একটি পরিবারের জীবনকে একটু সহজ করার মধ্য দিয়ে।
লেখক : প্রফেসর অব বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য।
কেকে/ এমএস