বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং টিকাদান কর্মসূচির সফলতা আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রশংসিত। কিন্তু এ অর্জনের আড়ালে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গভীর সংকট দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে— চিকিৎসা ব্যয়ের অসহনীয় চাপ। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ সাধারণ মানুষের জীবনে এক ভয়াবহ আর্থিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক গবেষণা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই রোগীদের নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়। অর্থাৎ অসুস্থ হলে একজন মানুষকে চিকিৎসার জন্য নিজের সঞ্চয় ভাঙতে, ঋণ নিতে কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতের এই সংকট সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধিরও অন্যতম কারণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর এই চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে, যেখানে ধনী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫ শতাংশ। অর্থাৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমন এক কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অসুস্থতা দরিদ্র মানুষের জন্য আরও বড় দারিদ্র্যের কারণ হয়ে উঠছে। ২০২২ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ৬১ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য এই বাস্তবতাকেই প্রমাণ করে।
এ অবস্থার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অপূর্ণতা। গবেষণা অনুযায়ী, দেশে মোট স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশই পূরণ হচ্ছে না। গ্রামীণ এলাকায় এই সংকট আরও তীব্র। অর্থের অভাব, মানসম্মত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করছে এবং পরবর্তীতে চিকিৎসা ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় গড়ে দুই লাখ টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার তথ্য নিঃসন্দেহে আতঙ্কজনক। একইভাবে হৃদরোগ, কিডনি রোগ বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ এসব রোগ এখন দেশে দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ সামনে স্বাস্থ্য খাতে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বাস্তবতায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে।
একইসঙ্গে কার্যকর জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালুর দাবিও এখন সময়ের বাস্তবতা। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার তার আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। স্বাস্থ্যসেবাকে যদি বাজারনির্ভর পণ্যে পরিণত করা হয়, তবে বৈষম্য আরও বাড়বে এবং স্বাস্থ্যখাতের অর্জনও টেকসই হবে না।
অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি কল্যাণরাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তাই স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সংস্কার, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দরিদ্রবান্ধব স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
কেকে/এলএ