কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর ফের উত্তেজনা ছড়াচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই আগ্রাসী আচরণ শুরু করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী— বিএসএফ। গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথের কয়েক ঘণ্টা আগে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইন করা হয়েছে। এতে সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত তীব্র বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান নেয়। বিশেষ করে বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যায়। একইসঙ্গে বিএসএফ সীমান্তজুড়ে সহিংস আচরণ শুরু করে। তাদের গুলিতে বহু বাংলাদেশি নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।
এ ছাড়া অবৈধ বাংলাদেশি তকমা দিয়ে সে দেশের মুসলিম নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। তবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে থাকে। কমে আসে বিএসএফের আগ্রাসী আচরণ। কিন্তু সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর আবার সীমান্তে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে ভারত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশবিরোধী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে তার শপথের আগে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো উচিত বলে মনে করেন তারা।
শুভেন্দুর শপথের আগেই সীমান্ত হত্যা : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের ছোড়া গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে ভারতের ভেতরে ধজনগর-পাথারিয়াদ্বার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর ৬০ ব্যাটালিয়ন। ৬০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম শরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিহত একজন কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ধজনগরের বাতেনবাড়ি গ্রামের হেবজু মিয়ার ছেলে মো. মুরসালিন (২০)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি কসবার গোপীনাথপুর আলহাজ শাহআলম ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। অপর নিহত ব্যক্তি হলেন একই ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের নবীর হোসেন।
নিহত মুরসালিনের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গত শুক্রবার রাতে স্থানীয় কয়েকজন এসে মুরসালিনকে বাড়ি থেকে ডেকে সীমান্তে নিয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর সীমান্তের ভারতীয় অংশে টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মুরসালিন মারা যান। পরে তার মরদেহ ভারতের ভেতরে নিয়ে যায় বিএসএফ।
বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে কসবা উপজেলার আনুমানিক ১৫ জন বাংলাদেশি চোরাকারবারি ভারতীয় চোরাকারবারিদের সহায়তায় চোরাচালানের উদ্দেশ্যে ভারতের প্রায় ২০০ গজ ভেতরে ধজনগর-পাথারিয়াদ্বার এলাকায় যান। পরে চোরাচালানের মালামাল নিয়ে ফেরার সময় বিএসএফের ৪৯ ব্যাটালিয়নের পাথারিয়াদ্বার ক্যাম্পের টহল দল তাদের বাধা দেয়। সে সময় বাংলাদেশি চোরাকারবারিরা বিএসএফ সদস্যদের ওপর চড়াও হন এবং একপর্যায়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, হাতাহাতির একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে দুটি ছররা গুলি ছোড়ে। এতে বাংলাদেশি মো. মুরসালিন (২০) ও অপর ব্যক্তি নবীর হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ভারতের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয় বলে বিএসএফ বিজিবিকে নিশ্চিত করেছে।
বিজিবি জানিয়েছে, বিএসএফকে প্রতিবাদলিপি পাঠানো এবং ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের প্রক্রিয়া চলছে।
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ছামিউল ইসলাম বলেন, দুজনের লাশ বিএসএফের কাছে আছে। লাশ দেশে নিয়ে আসার বিষয়ে বিজিবির সদস্যরা কাজ করছেন।
ফের শুরু পুশইন : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো ১০ বাংলাদেশি নাগরিককে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার বিকেলে কুলাউড়া থানায় স্বজনদের উপস্থিতিতে তাদের হস্তান্তর করা হয়। কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফরহাদ মাতব্বর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
ওই ব্যক্তিরা হলেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের বাসিন্দা রাহুল তালুকদার (২৭), খালিয়াজুড়ী উপজেলার যোগীমারা গ্রামের যুবরাজ সরকার (৪২), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাঙাধর গ্রামের হাবুল দাস (৪৮), হাবুলের স্ত্রী সুমিত্রা দাস (৪৪), মেয়ে অনামিকা দাস (১৭) ও ভূমি দাস (৭), ছেলে হেমন্ত দাস (১৬), হামতপুর গ্রামের গোপাল দাস (২৭), সদর উপজেলার বক্তারগাঁও গ্রামের মো. আল আমিন (৩৫) ও আল আমিনের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (১৯)।
কুলাউড়া থানার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মুরইছড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য পড়েছে। গত শুক্রবার সকালের দিকে মুরইছড়া চা-বাগান এলাকায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ জনকে সন্দেহজনক অবস্থায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৪৬ ব্যাটালিয়নের স্থানীয় মুরইছড়া ক্যাম্পের টহল দল। পরে তাদের আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তিরা জানান, তারা বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি বিএসএফ তাদের আটক করে। এরপর সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠায়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। খবর পেয়ে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে স্বজনেরা থানায় পৌঁছালে ওই ব্যক্তিদের তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কেকে/এলএ