মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধে স্থবির রাজধানী      শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর      পরীক্ষা স্থগিত ও শিক্ষামন্ত্রীর পতদ্যাগ দাবি পরীক্ষার্থীদের, বৈঠকে কর্মকর্তারা      ২৪ ঘণ্টায় হামে সাত শিশুর মৃত্যু      হাসিনার ফিরে আসার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা      মেধাবী উদ্যোক্তাদের ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা দেবে সরকার      সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির সভাপতির দায়িত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৯:৩৮ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা পর্যায়ের মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এ মূল্যহার চলতি বছরের জুন মাসের বিল থেকে কার্যকর হবে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও ভোক্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সীমিত আয়ের এই শ্রেণির জন্য বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের বাড়তি চাপ মাসিক বাজেট সামলানো আরও কঠিন করে তুলবে। একইসঙ্গে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা। 

গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাব্য ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপরও প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যাবে, যা সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।

বিইআরসি জানায়, পুনর্নির্ধারিত পাইকারি ও সঞ্চালন মূল্যহার এবং বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণির বিদ্যমান খুচরা বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণির ডিমান্ড চার্জ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা সীমিত করার লক্ষ্যে পিডিবির অধীন বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিভিত্তিক ১২ শতাংশ রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (রেট অব রিটার্ন) কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ন্যূনতম পর্যায়ে রিটার্ন নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে পারলেও অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ না পায়।

এর আগে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গত ২০ ও ২১ মে দুই দিনব্যাপী গণশুনানি আয়োজন করে বিইআরসি। সেখানে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। 

প্রস্তাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করে।

কমিশন জানায়, এসব আবেদন বিইআরসির কারিগরি কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিদ্যুতের উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবারের মাসিক ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, কেমিক্যাল ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্প খাত অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে। শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে, তাহলে বাজারে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্যেও প্রভাব পড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি শিল্প ও বাণিজ্য খাতে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। উৎপাদন খরচ বাড়লে অনেক কারখানার জন্য বর্তমান দামে পণ্য উৎপাদন ও বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে থাকে। সেখানে বিদ্যুতের মতো মৌলিক ইনপুটের দাম বাড়লে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এর ফলে অর্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের খরচ সামলানোর সক্ষমতা সীমিত। বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি পেলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে বা কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বাজেটের আগে তড়িঘড়ি করে আবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী আখ্যায়িত করে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। 

তিনি বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি দেশের স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেবে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে এমনিতেই সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে, তখন বিদ্যুতের এ মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিসহ করে দেবে।

তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চুরি, দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনা কমিয়ে আনতে পারলে এখন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় আরও বেশ কিছুকাল সরকারকে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। 

তিনি আগামী জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের  উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ সামগ্রিক পরিকল্পনা পেশ করার দাবি জানান। 

রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আতাউর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি থেকে শুরু করে খাবার ও অন্যান্য খরচও ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে সাধারণ পরিবারের জন্য দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। মাস শেষে সঞ্চয় দূরের কথা, অনেক সময় মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বা জ্বালানির বৈশ্বিক দামের কারণে যদি কিছুটা মূল্য সমন্বয় করতে হয়, সেটি মানুষ বুঝতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় যদি অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতির কারণে খরচ বেড়ে থাকে, তাহলে তার দায় কেন সাধারণ মানুষ বহন করবে? বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে বারবার মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।’

আতাউর রহমান বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মান আরও নাজুক হয়ে পড়বে। তাই শুধু মূল্য সমন্বয় নয়, বরং খাতটির ভেতরের অদক্ষতা ও অপচয় কমানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি জীবনে নয়, শিল্প-কারখানা, কৃষি, পরিবহন ও সেবা খাতসহ অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ফলে শেষ পর্যন্ত এর চাপ ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিদ্যুৎ, এলপিজি, ডিজেল, কেরোসিন ও ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ক্যাবসহ বিভিন্ন পক্ষ অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি জানালেও সেগুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য ভর্তুকি ও বিল সহায়তার ব্যবস্থা করছে। সেখানে ভর্তুকি কমানোর যুক্তিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব বাড়লেও দেশে সে ধরনের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। পল্লি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও সক্ষমতার ঘাটতি শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।’

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি   চাপে পড়বে নিম্নবিত্ত   চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close