ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর সম্প্রতি রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নেয় বিজেপি। এ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সংক্রান্ত। এ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
এর আগে থেকেও তারা সীমান্তে বেড়া দেওয়ার নামে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করে আসছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে এসব নিয়ে তেমন কোনো কথা বলা হয়নি। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে পরিবেশ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তখন থেকে বাংলাদেশ তার ন্যায্য অধিকারের বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেয়। ফলে সেই থেকে দেশের সার্বভৌত্ব রক্ষায় ও সীমান্তের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার মনোভাব স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ।
সম্পর্ক রক্ষা বা নতুন করে তৈরির কথা বললেও সব সময় অবস্থান বদল করে আসছে ভারত। সীমান্তে গুলি করে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর বিষয়ে বারবার আলোচনা হলেও তারা তা মানছে না। একের পর এক সীমান্তে গুলি করে তারা মানুষ হত্যা করছে। রাতের আঁধারে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে তাদের দেশে বসবাস করা মানুষকে কথিত বাংলাদেশি বলে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে সীমান্তে তারা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছে। আর এসব নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সীমান্তের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবে না। গতকাল বুধবারও সাতক্ষীরা সীমান্তে দুইজনকে গুলি করে আহত করেছে বিএসএফ।
এর আগে, যশোরের বেনাপোল সীমান্তের শূন্যরেখায় সাদিপুর মাঠে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করে কথিত বাংলাদেশিদের। যদিও বিজিবির শক্ত অবস্থানের কারণে তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। তিন দিন পর পুশইনের উদ্দেশ্যে আনা কমপক্ষে ১০ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। এতে যদিও সীমান্তে উত্তেজনা সাময়িক কমেছে। তবে তারা অন্য সীমান্ত পথে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে নাকি ওপারে অবস্থান করছে- তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিজিবির দাবি, বেনাপোল সীমান্ত পথে বিজিবির কঠোর প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বিএসএফ তাদের সরিয়ে নিয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে সীমান্ত থেকে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করা ব্যক্তিদের বিএসএফ সরিয়ে নিলে উত্তেজনা কমে আসে। শূন্যরেখা থেকে ওই ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়ার পর সীমান্ত থেকে বিজিবির অতিরিক্ত সদস্যও প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে সীমান্তের ওই এলাকায় স্বাভাবিক টহল চলছে।
সাদিপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ পুশইনকে কেন্দ্র করে গত তিন দিন ধরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এ সময় মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা ১০ জন।
স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে জানা যায়, কোনো ধরনের দ্বিপক্ষীয় নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। এ উদ্দেশ্যে তাদের সীমান্তের শূন্যরেখায় বসিয়ে রাখা হয়। খোলা আকাশের নিচে প্রখর রোদ মাথায় ঝোপঝাড়ের মধ্যে অবস্থান করায় চরম দুর্ভোগে পড়েন তারা। তবে আটকে থাকা ব্যক্তিরা বাংলাদেশি নাগরিক- এমন কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র বা তথ্য না পাওয়ায় তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় বিজিবি। নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
গত ৩১ মে রাতে বেনাপোল সীমান্তের ওপারে ভারতের হরিদাসপুর এলাকায় তিনটি ট্রাকে করে শতাধিক মানুষকে জড়ো করে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সীমান্তের ভারতীয় অংশে আরও শতাধিক মানুষকে অবস্থান করিয়ে রাখা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভারতে অনুপ্রবেশকারী শনাক্তকরণ ও উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর থেকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও। বিশেষ করে ভারতে জন্মগ্রহণকারী ও দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত অনেক মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বেনাপোলের সাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান লিটু বলেন, ‘সীমান্তে এখন আর ভিড় করা মানুষজনকে দেখা যাচ্ছে না। তবে বিএসএফ অন্য সীমান্ত পথে তাদের ঢোকাতে পারে। তাই বিজিবিকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশপ্রেমের জায়গা থেকে গ্রামবাসী সার্বিক সহযোগিতা করছে বিজিবিকে।’
এ বিষয়ে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, ‘বিএসএফ যদি প্রচলিত নিয়ম ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কাউকে ফেরত পাঠায়, তাহলে যাচাই-বাছাই শেষে তাদের গ্রহণ করা হবে। কিন্তু কোনো নিয়ম-নীতি না মেনে জোরপূর্বক কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. আ স ম আলী আশরাফ বলেন, ‘পুশ-ইন ইস্যুটি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া সীমান্তের বিষয়ে বাংলাদেশকে ভারতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে) খোলামেলা আলোচনা করে এর সমাধান করা প্রয়োজন।’
কেকে/এমএ