মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বড়রিয়া গ্রামে মাদকাসক্তির এক চরম ও বর্বরোচিত রূপ প্রত্যক্ষ করল এলাকাবাসী। মাদকের টাকা না পেয়ে আপন ছোট ভাই বিজয় মাহমুদ চাঁদের বসতবাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে বড় ভাই সিজয় মাহমুদ আকাশ।
শনিবার (৬ জুন) বিকালে উপজেলার বড়রিয়া গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটে।
অভিযুক্ত আকাশ গ্রামের মৃত আবু বক্কার সিদ্দিকীর বড় ছেলে।
এই বর্বরোচিত ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যেই একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থল ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত সিজয় মাহমুদ আকাশ দীর্ঘ দিন ধরে মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত। মাদকের টাকার জোগাড় করতে সে প্রায়শই ঘরের বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র ও মালামাল চুরি করে বিক্রি করে আসছিল। সম্প্রতি সে জোরপূর্বক ঘরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মালামাল বিক্রি করে দিলে তার ওপর চরম অতিষ্ঠ হয়ে ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং তাদের জন্মদাত্রী মা মহম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
থানায় অভিযোগ করার খবর জানতে পেরে সিজয় মাহমুদ আকাশ তীব্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আজ দুপুরে সে তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে একা পেয়ে নানাভাবে গালিগালাজ, হুমকি-ধমকি প্রদানসহ পুরো বাড়িতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মারার ভয়ভীতি দেখায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে আকাশ আজ বিকাল ৫টার সময় সবার অলক্ষ্যে বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে ছোট ভাই বিজয় মাহমুদ চাঁদের বসতবাড়িতে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। টিন ও কাঠের তৈরি ঘর হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।
ভয়াবহতা দেখে প্রতিবেশীরা এসে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান এবং মহম্মদপুর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয়দের যৌথ ও জোরালো পদক্ষেপে দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে ঘরের ভেতরের মূল্যবান আসবাবপত্র, পরিধেয় বস্ত্র, নগদ টাকা এবং শিক্ষাগত ও জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে পরিবারটির কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনাস্থলে কান্নায় ভেঙে পড়েন আকাশের বৃদ্ধা মা (যিনি ভুক্তভোগী চাঁদেরও মা)। তিনি বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমি ওর গর্ভধারিণী মা হয়েও আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি—ও একটা কুলাঙ্গার, একটা রাক্ষস! নেশার টাকার জন্য ও নিজের ভাইয়ের ঘরে আগুন দিছে। এর আগেও ও ঘরের জিনিসপত্র চুরি করে আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলছিল, যে কারণে আমরা মা-বউ মিলে থানায় অভিযোগ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেই রাগে ও আজ আমাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও পুড়িয়ে কয়লা করে দিল। নিজের পেটের ছেলে হলেও আমি এই মাদকাসক্ত ও অপরাধীর কঠিন বিচার চাই, ওর দৃষ্টান্তমূলক কঠিন শাস্তি হোক।’
মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ভুক্তভোগী ছোট ভাইয়ের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আর্তনাদ করে বলেন, ‘নেশার টাকার জন্য আমার গোছানো সংসার ও শেষ আশ্রয়টুকুও আগুন লাগিয়ে শেষ করে দিল। আমরা এখন কোথায় দাঁড়াবো? বাচ্চাদের নিয়ে কই যাবো? আমি এই পাষণ্ডের কঠিনতম বিচার চাই।’
মহম্মদপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের টিম সর্বোচ্চ গতিতে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ঘরটি দ্রুত দাহ্য প্রকৃতির হওয়ায় ভেতরের মালামাল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে পাশে থাকা অন্য ঘরগুলো রক্ষা করা গেছে।
এদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ও মহম্মদপুর থানা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মহম্মদপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, এই বিষয়ে পূর্বের ও বর্তমানের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কেকে/এমএ