সর্তা বনবিটের ভেতরে এখন আর আগের সেই ঘন সবুজের দেখা মেলে না। যেখানে একসময় সারি সারি সেগুন, গামারী ও প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা পুরোনো গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন অনেক জায়গায় পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডালপালা আর ফাঁকা জমি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছরের ব্যবধানে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ কার্যত উজাড় হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন সর্তা বনবিটে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বন নিধনের পেছনে মো. মহসিন নামের ইটভাটা মালিকের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
বন বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সামাজিক বনায়নের সেগুন বাগান থেকে শুরু করে কয়েক দশকের পুরোনো গাছ পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়েছে। এসব কাঠ বিক্রি করে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।
পূর্ব খিরাম এলাকার বনাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে গাছ কাটার স্পষ্ট চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে। কোথাও কাটা গাছের গুঁড়ি, কোথাও সদ্য পরিষ্কার করা জমি।
স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর ধরে ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে কাঠ পরিবহন করা হলেও কার্যকরভাবে তা ঠেকানো হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, ‘গাছ কাটার ঘটনা কোনো গোপন বিষয় ছিল না। দিনের বেলাতেও কাঠ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এত বড় আকারে বন উজাড় হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’
জানা যায়, গত কয়েক বছরে সর্তা বনবিটের অন্তত ২০ একরের বেশি এলাকায় থাকা সেগুন বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। কাটা গাছের মধ্যে সামাজিক বনায়নের পাশাপাশি ৬০-৭০ বছর বয়সী প্রাকৃতিক গাছও ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পূর্ব খিরামের সুলতাননগর, তালুকদারের ঘোনা, প্যাঁচপেইচ্ছা ও বালুখালী এলাকা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বনাঞ্চলের গাছ কাটার অভিযোগে মো. মহসিনের বিরুদ্ধে বন আইনে দায়ের করা দুইটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তবে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, কাটা গাছের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও আর্থিক মূল্য নির্ধারণে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. মহসিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনকল ও খুদে বার্তারও জবাব মেলেনি।
সর্তা বনবিট কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’
হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও দায়ীদের শনাক্তে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংসের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এমএ