অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার আশায় বছরের পর বছর পরিবার ছেড়ে বিদেশে কাটান কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার হাজারো যুবক। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বদলে যাচ্ছে অনেক পরিবারের ভাগ্য, গড়ে উঠছে নতুন নতুন বাড়িঘর, বাড়ছে জীবনযাত্রার মান। তবে এই উন্নয়নের আড়ালে নীরবে জন্ম নিচ্ছে আরেক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছিন্ন জীবন, পারিবারিক যোগাযোগের দুর্বলতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে বাড়ছে দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক সংকট।
গত এক মাসে উপজেলায় প্রায় একশোটি প্রবাসী পরিবার পরকীয়াজনিত সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক জটিলতায় জড়িয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মেঘনা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অভিযোগ ও পারিবারিক বিরোধের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।’
নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল অধ্যুষিত মেঘনা উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসীনির্ভর এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, উপজেলার প্রায় ৪০ শতাংশ পুরুষ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ৫ শতাংশ অবিবাহিত যুবক উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। আরও প্রায় ১৫ শতাংশ অবিবাহিত যুবক পড়াশোনা ছেড়ে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রবাসে রয়েছেন। ফলে উপজেলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবারে স্বামী বা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী সদস্য দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকেন।
স্থানীয়দের মতে, অর্থনৈতিক উন্নতি যেমন হয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধনও দুর্বল হয়ে পড়েছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক মেলামেশা অনেক সময় সম্পর্কের অবনতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এর প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; সন্তানদের মানসিক বিকাশ, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মেঘনা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মতিন বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সামাজিক বিপর্যয়। তবে এর জন্য শুধু অন্যকে দায়ী করলে চলবে না। পরিবার থেকেই সচেতনতার শুরু হতে হবে।’
তিনি মনে করেন, সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা, অল্প বয়সীদের হাতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া, তাদের চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের খোঁজ না রাখা এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সমাজকে বদলাতে হলে আগে পরিবারকে ঠিক করতে হবে।
লেখক সোহেল বলেন, ‘পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য পুরুষ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে বিদেশে যান। কঠোর পরিশ্রম করে তারা পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় সেই ত্যাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে শুধু একটি সংসার ভেঙে যায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সমাজের স্বাভাবিক পরিবেশও।’
এ বিষয়ে স্থানীয় আলেম সমাজও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রবাসে যাওয়া প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন দাম্পত্য বিচ্ছিন্নতা নানা ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে। এছাড়াও বর্তমানে অনেক যুবক বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই স্ত্রীকে রেখে বিদেশে চলে যান। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পারস্পরিক যোগাযোগ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা কমে গেলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
শিক্ষকদের মতে, সমস্যাটিকে শুধু পরকীয়া বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না; এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানা বাস্তবতা। তাই পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। একসময় প্রবাসকে কেবল অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান বাস্তবতা প্রমাণ করছে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় প্রবাসজীবনের অর্জন যতই বাড়ুক না কেন, পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক অস্থিরতার ক্ষত দীর্ঘদিন ধরে পরিবার ও সমাজের গভীরে থেকে যাবে।
কেকে/এমএ