পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার মূল ভূখণ্ডের মানচিত্র অনুযায়ী তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ভাঙন কবলিত তীরবর্তী এলাকার দৈর্ঘ্য ১৫-২০ কিলোমিটার। উপজেলার রণগোপালদী ইউনিয়নের পাতার চর থেকে শুরু করে দশমিনা সদর ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলটি নদী ভাঙন ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
জানা গেছে, তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীর অব্যাহত ভাঙনে উপজেলার রনগোপালদী, দশমিনা সদর ও বাঁশবাড়িয়া- এই তিন ইউনিয়নের তেতুলিয়া ও বুড়ি গৌরাঙ্গ নদীর তীরবর্তী এলাকার অনেক বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর তীররক্ষা বাঁধ প্রতিনিয়ত ভাঙনের কবলে পড়ছে নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা। এতে বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। ভাঙনের মুখে প্রতিদিনই কোনো না কোনো মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল, বেড়িবাঁধ ও ব্লকসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের বাঁশবাড়ীয়া ও ঢনঢনিয়া, দশমিনা সদর ইউনিয়নের দশমিনা, হাজীরহাট, কাটাখালী, গোলখালী ও সৈয়দজাফর, রণগোপালদী ইউনিয়নের পূর্ব আউলিয়াপুর, আউলিয়াপুর, চরঘুনি ও পাতারচর এবং চরবোরহান ইউনিয়নের দক্ষিণ চরবোরহান গ্রামের নদীতীরবর্তী মানুষজন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে, উপজেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত ইউনিয়নগুলোতে বেড়িবাঁধ থাকলেও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরবোরহান ইউনিয়নের চারদিকে নদী থাকা সত্ত্বেও বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে নেই কোনো বেড়িবাঁধ। ফলে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলে ওই ইউনিয়নের মানুষের জীবন-জীবিকা।
জানা যায়, আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল হলেও মূলত আশ্বিন পর্যন্ত টানা চার মাস বর্ষার দাপট থাকে। অন্যদিকে চৈত্র-বৈশাখ থেকেই বাড়তে থাকে পানির চাপ। এ সময় নদীভাঙনে বিলীন হয় মানুষের ভিটেমাটি ও শেষ সম্বল। তাই এ সময়গুলোতে সব হারানোর শঙ্কায় দিন কাটে নদীতীরের মানুষের।
ভাঙনের শিকার দশমিনা সদরের হাজীরহাট লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভাঙন প্রতিরোধে প্রকল্প তৈরি এবং তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে।
তাৎক্ষণিকভাবে ফেলা এসব জিও ব্যাগ ভাঙনের তীব্রতার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করেন তারা।
তাদের মতে, এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও ভুক্তভোগীদের জন্য টেকসই সমাধান হচ্ছে না।
এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন খোকন বলেন, “বাপ-দাদার অনেক কৃষিজমি তেঁতুলিয়া নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হাজীরহাট বাজারের অধিকাংশই নদীগর্ভে চলে গেছে। স্থানীয় মুসল্লিদের আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বায়তুল ফজল জামে মসজিদের সামনের অংশের বারান্দা ইতোমধ্যে তেঁতুলিয়ায় বিলীন হয়েছে।’’
দশমিনা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফখরুজ্জামান বাদল বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিয়ে বর্ষা মৌসুমে জিও ব্যাগ ফেলে। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় মাত্র। শুষ্ক মৌসুমে ব্লক দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হলে বর্ষা মৌসুমে আমরা নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতাম।”
হাজীরহাট লঞ্চঘাট বায়তুল ফজল জামে মসজিদের ইমাম মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, “কয়েক দিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড মসজিদটি রক্ষায় ২৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকার একটি বাজেট দিয়েছে। ওই বাজেটের কাজ অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হওয়ায় মসজিদের বারান্দা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। কয়েক দিন আগে পানির উচ্চতা কম ছিল। ওই সময়ে দুই দিন কাজ বন্ধ ছিল। সে সময় কাজ চলমান থাকলে হয়তো মসজিদের বারান্দা বিলীন হতো না। এমনকি মসজিদের ভেতরেও বড় বড় ফাটল ধরেছে।”
লঞ্চঘাট বেড়িবাঁধ এলাকার বাসিন্দা কবির বলেন, “সবকিছুই তো নদীতে ভেঙে চলে গেছে। এখন কোনো রকমে একটি ছাপড়া ঘর করে নদীতীরে বসবাস করছি। জানি না এবার বর্ষায় এটুকুও টিকিয়ে রাখতে পারব কি না।”
উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের ঢনঢনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোশারেফ হোসেন রাড়ি বলেন, “নদীভাঙন নিত্যদিনের ঘটনা। গত ১০ বছরে তিনবার বসতভিটার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। তারপরও নদী আমাদের পিছু ছাড়ছে না। আবার ভাঙনের কবলে পড়লে কোথায় যাব, জানি না।”
শুধু কবির কিংবা মোশারেফ নন, এমন শঙ্কায় রয়েছেন উপজেলার নদীতীরবর্তী চার ইউনিয়নের অন্তত দুই সহস্রাধিক পরিবার।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কর্তৃপক্ষ ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এখন স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। তাদের মতে, টেকসই বেড়িবাঁধ ও স্থায়ী ব্লক ছাড়া তেঁতুলিয়ার ভাঙন রোধ সম্ভব নয়।
পাউবো পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাজীরহাট এলাকায় মসজিদ এবং এর পাশের বেড়িবাঁধ রক্ষার্থে মোট ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।
পটুয়াখালী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব মুঠোফোনে বলেন, “পটুয়াখালী জেলায় নদীর অভাব নেই। নদীর দুই পাড়েই ব্যাপক ভাঙন হয়। আসলে সব জায়গায় কাজ করার মতো সক্ষমতা এখনও আমাদের নেই। যেসব স্থাপনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেমন মসজিদ, বেড়িবাঁধ ও স্কুল—সেগুলোতে আমরা বেশি অগ্রাধিকার দিই। বাকি ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোও আমি পরিদর্শন করেছি। সেখানেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একটি প্রকল্পের জন্য নদী সমীক্ষা চলমান রয়েছে। ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা বড় একটি প্রকল্প প্রস্তাব করব। আপাতত বর্ষাকালে যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা বেড়িবাঁধ ভেঙে না যায়, সে বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি। দশমিনার হাজীরহাটে মসজিদ ও পাশের বেড়িবাঁধ রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। বালু সংকটের কারণে একদিন কাজ বন্ধ ছিল। আরও কয়েকটি পয়েন্ট পরিদর্শন করেছি। সেগুলোতেও আমরা কাজ করব।”
উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরবোরহান ইউনিয়নের বিষয়ে মো. রাকিব বলেন, “নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হলে নতুন প্রকল্প ও সমীক্ষা প্রয়োজন। আমাদের চলমান সমীক্ষার আওতায় চরবোরহানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সমীক্ষা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তারা যে সুপারিশ দেবে, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করব।’
কেকে/এমএ