বাংলাদেশে একসময় প্রচুর পরিমাণে ডেনমার্কের উন্নয়ন প্রকল্প বা ‘ড্যানিশ প্রজেক্ট’ দেখা যেত। কিন্তু এখন এমন কী হলো যে, আগের মতো আর ডেনমার্কের প্রকল্পগুলো চোখেই পড়ে না? এটির মূল কারণ কী, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? হয়তো এর পেছনে রয়েছে এদেশীয় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। ডেনমার্ক এমন একটি দেশ, যাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু নেওয়ার এবং শেখার আছে। ডেনমার্ক ইতোমধ্যেই তাদের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘রিনিউয়েবল ন্যাচারাল গ্যাস’ বা নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের (আরএনজি) ব্যবহার নিশ্চিত করেছে।
আর এই প্রযুক্তিতে ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসও অনেক এগিয়ে রয়েছে। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও এই নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস (আরএনজি) বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল সম্পদ হয়ে পড়ে আছে, যা আমাদের এখানকার বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা এখনো মনে হয় উপলব্ধি করতে পারেননি! হ্যাঁ, এটাই বাস্তবতা- যেভাবে এদেশের মানুষ বারবার মিথ্যা বুলি আর অপকৌশলের দ্বারা প্রতারিত হয়। আসলে বায়োগ্যাস, আরএনজি (নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস), প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি এবং ডিএমই (ডাইমিথাইল ইথার) এসবের মূল উপাদানের মধ্যে তেমন কোনো বড় পার্থক্য নেই।
কিন্তু জাতিকে প্রতিনিয়ত ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেওয়া হচ্ছে শুধু ভুল ব্যাখ্যা, বিভ্রান্তিকর প্রচার আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির আড়ালে। যেমন- ‘নবায়নযোগ্য’ বা ‘রিনিউয়েবল’ বললেই আমরা সাধারণত শুধু সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ বুঝি; কিন্তু বাস্তবে নবায়নযোগ্য উপায়ে প্রায় সবকিছুই তৈরি করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে সার, ইট, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ, চিনি এবং বিভিন্ন জ্বালানি উপাদান। এই যেমন, নবায়নযোগ্য ইথানল (রিনিউয়েবল ইথানল) আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার। অথচ এই মূল্যবান নবায়নযোগ্য ইথানলকে কাজে না লাগিয়ে আমরা আমেরিকা থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ছি। অথচ শুধুমাত্র একটি ‘জ্বালানি হাব’ বা ‘এনার্জি হাব’ ঘোষণা করার মাধ্যমেই আগামী ১০ বছরে এই খাতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা সম্ভব। আর এটি করা গেলে বাংলাদেশের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান যেমন হবে, তেমনি আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের একটি উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাও নিশ্চিত হবে।
কিন্তু কিভাবে? দেশের প্রতিটা কোণায় যে ল্যান্ডফিল/ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়ে আছে, এটাকে যদি আমরা প্রপার ডিজাইনের অধীনে আনতে পারি, এর থেকে ‘এএএফ (টেকসই বিমান জ্বালানি), রিনিউয়েবল ডিজেল, রিনিউয়েবল ন্যাপথা, বায়ো-প্লাস্টিকসহ পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেলের বিকল্প প্রায় সব কিছুই.. তৈরি করা সম্ভব। তাহলে সারা পৃথিবী থেকে এই খাতে যেমন হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে তেমনি আমাদের টাকার আর সমস্যা হবে না- অর্থাৎ আমাদের মূল কাঠামোগত পরিকল্পনাটি ঠিক হয়ে গেল। যাযাবরের মতো জেট ফুয়েলের জন্য আর আরবদের কাছে মাথা নোয়াতে হলো না। ‘এই প্রযুক্তিটি এখন সারা বিশ্বেই সহজলভ্য, যা মূলত ‘১ শতাংশ এসএএফ (সাস্টেইনেবল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল) বাধ্যতামূলক কার্যক্রম’ নামে পরিচিত। আমরা জ্বালানি খাতে প্রচুর লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করেছি, এ ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটির কাছে ২০ দফা সমন্বিত জ্বালানি প্রস্তাবনা প্রেরণ করেছি।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মনস্তত্ত্ব ও খেলার ধরন এমনভাবেই তৈরি, যাতে তারা যুগোপযোগী ও উচ্চ প্রযুক্তির (হাই-টেক) সহায়তায় ধনী থেকে আরও ধনী হতে পারে। আর আমাদের মতো দেশে বিভিন্ন অজুহাতে তাদের পচা বর্জ্য বা বাতিল প্রযুক্তি রপ্তানি করে আমাদের সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংস করার পাশাপাশি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুটপাট করে নিয়ে যায়। এর কিছু নমুনা আমরা ইতোমধ্যেই প্রত্যক্ষ করেছি; যেমন- রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, রূপপুর (প্রথম প্রজন্ম বা ১জি প্রকল্প), সব ধরনের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং জাইকার অর্থায়নে করা কয়লা ভিত্তিক প্রকল্পসহ এমন আরও অনেক কিছু। অথচ এখন নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর এক দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা মূলত ‘সাসটেইনেবল পিপলস ইকোনমি’ (এসপিই) নামে পরিচিত। কিন্তু চাইনিজ সিএমইসি কোম্পানি এবং দেশীয় কিছু দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর কারণে এখানে এক নতুন ধ্বংসলীলার উপাখ্যান রচিত হতে যাচ্ছে।
এই ধরনের বিতর্কিত প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ সব আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার খড়গ নেমে আসবে আমাদের ওপর। রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আমরা কত প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, কত তোষামোদ করেছি; কিন্তু রামপাল কি শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্ষতি করছে না? যেখানে চীন, কোরিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশে বর্জ্য থেকে জ্বালানি বা ‘ওয়েস্ট টু ফুয়েল’ তৈরির চমৎকার ও নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তি রয়েছে, সেখানে আমাদের আমিনবাজারে কেন তারা সেই একই প্রযুক্তির অনুকরণ করছে না? বাংলাদেশের জন্য বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বিশাল সম্পদকে এভাবে ছেলেখেলা করে নষ্ট করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। আর এই ভুল ও আত্মঘাতী পরিকল্পনাই এই প্রাণবন্ত জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’
বিলুলিয়া মৌজার গভীরে বাংলাদেশের এক বৃহৎ ও বিশুদ্ধ ভূগর্ভস্থ পানির বিশাল আধার বা রিজার্ভ রয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যেই বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা ‘লিচেট স্টাডি’ বা বর্জ্যের বিষাক্ত তরল পরিশোধনের গবেষণার নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতি হয়ে গেছে। এর ফলে পুরো এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ (ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা) ইতিমধ্যে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, দূষণের কারণে এলাকার প্রচুর মানুষ আজ ক্যান্সারসহ নানা প্রাণঘাতী ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে দেশরক্ষাকারী প্রযুক্তি হিসেবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি বা ‘ওয়েস্ট টু ফুয়েল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রিয় জাতিকে সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
আর আমেরিকার এই নিখরচায় বা ‘ফ্রি’ পাওয়া প্রযুক্তিটি এখানে প্রয়োগ করলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নেক নজর মিলবে; নিশ্চিত হবে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি, বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ (এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন। সেই সঙ্গে নবায়নযোগ্য ইথানল রপ্তানি করে শহীদ জিয়ার লালিত স্বপ্ন ‘সাসটেইনেবল পিপলস ইকোনমি’ (এসপিই) স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাস্তবায়িত হয়ে যাবে।
প্রিয় বিএনপির কাছে দোহাই লাগে, দয়া করে আপনারা এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। অতীতে আমরা অনেক বড় বড় সুযোগ হারিয়েছি, অনেক কিছু বুঝতেই পারিনি। বিনামূল্যে সাবমেরিন ক্যাবল, স্যামসাং বা আরামকোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, পেশাদার অধ্যাপক কিংবা পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে মিস্টার ফিজারের মতো সুযোগগুলো হারিয়ে আমরা ইতোমধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে ফেলেছি। আর নয়, দয়া করে এবার থামুন! আমিনবাজারের এই চাইনিজ ইনসিনেটর বা বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার ক্ষতিকর প্রকল্পটি নতুন করে সাজান।
মাতুয়াইলে বা ঢাকা দক্ষিণে কোরিয়ান বন্ধুরা যেভাবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরির সফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, ঠিক সেই একই নকশায় বা ‘সেম ডিজাইন’-এ কাজটি করলেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। কারণ দিনশেষে আমাদের একটিই মাতৃভূমি, একটিই দেশ, একটিই প্রিয় বাংলাদেশ। আর এই আমানত রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব আমাদের সকলের।’
‘তাহলে সারা পৃথিবী যেটা বর্জন বা রিজেক্ট করে দিয়েছে, সেই চাইনিজ ইনসিনেটর ব্যবস্থা (বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার সিস্টেম) আমাদের কী কী ক্ষতি করবে- এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক :
আমাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মূল্যবান সম্পদ পুড়িয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল বা ‘এক্সপেনসিভ’ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রকারান্তরে প্রতি ইউনিটে ১৪ টাকা করে ভর্তুকি দিতে হবে এবং এই হাজার কোটি টাকা তারা ডলার হিসেবে নিজ দেশে নিয়ে যাবে। এটা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক, কারণ তাদের দেশে অলস পড়ে থাকা অকেজো ইনসিনেটরগুলো বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ঋণ (লোন) কিংবা প্রযুক্তি হস্তান্তর কর্মসূচির (টেক ট্রান্সফার প্রোগ্রাম) মাধ্যমে আমাদের ঘাড়ে চাপানো হবে এবং এর আড়ালে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুটপাট করে নেওয়া হবে।
এই প্রক্রিয়ায় ডাইঅক্সিন, ফিউরান এবং ভারী ধাতুর (হেভি মেটাল) মতো মারাত্মক বিষাক্ত উপাদান পুরো ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়লেও তার জন্য তারা কোনোভাবেই দায়ী বা ‘লায়াবেল’ থাকবে না; এরা যেন এক নতুন আদানি-চাইনিজ সিএমইসি গ্রুপ। এর ফলে এদেশের লাখ লাখ গরিব মানুষের ক্যান্সার হবে, আর তারা শেষ সম্বল জায়গা-জমি বিক্রি করে চীন ও ভারতে ক্যান্সারের চিকিৎসার (ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট) জন্য লাইন ধরবে। এতে তাদের আরও বেশি ব্যবসা ও টাকা আসবে, সমস্যা কী? ততদিনে আমাদের নীতিনির্ধারক সচিব মহোদয় হয়তো কানাডার নাগরিক হয়ে আরামের জীবন কাটাবেন!
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন- এই পুরো ধারণাটিই (ওয়েস্ট টু এনার্জি) এই জাতিকে ধ্বংস করার একটি সম্পূর্ণ ভুল ও আত্মঘাতী পথ। এর বিপরীতে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরি (ওয়েস্ট টু ফুয়েল) অত্যন্ত চমৎকার একটি সমাধান, যা ঢাকা দক্ষিণে কোরিয়ান বন্ধুরা সফলভাবে করছে। চীনেও এই প্রযুক্তি আছে এবং তারা নিজেদের দেশে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরি করছে; অথচ আমাদের ধ্বংস করার জন্য তারা এখানে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফাঁদ পাতছে।
এই প্রকল্পের ১১টি শর্ত সম্পূর্ণ দেশ ও জনস্বার্থবিরোধী। (সূত্র : ইউটিউবে চ্যানেল ওয়ান নিউজ)।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে লাখ লাখ টন দূষিত ও বিষাক্ত পানি (পলিউটেড ওয়াটার) আশপাশের জলাশয় এবং নদীগুলোতে গিয়ে পড়বে, যা পুরো পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলবে।
কোনো ক্ষয়ক্ষতির জন্যই তারা দায়বদ্ধ থাকবে না, কারণ আমাদের সঠিক বিচারবুদ্ধি ও দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। ফলে তারা আমাদের দেশে যা খুশি তা-ই করার ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।
দয়া করে এই দেশটাকে ধ্বংস করবেন না। ঢাকা দক্ষিণে কোরিয়ান বন্ধুরা যেভাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (টেকনোলজি ফ্রি) কাজ করছে, ঠিক সেই একই উপায়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরির আধুনিক মার্কিন প্রযুক্তি (আমেরিকান টেকনোলজি) ব্যবহার করুন; যা আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির জন্য প্রকৃত অর্থেই কল্যাণ বয়ে আনবে।’
কেকে/এমএ