উজানের ঢল ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যদিও পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তা যে কোনো সময় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে উত্তরের জেলাগুলোতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়া এবং চরাঞ্চলে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় তিস্তার পানি আরও বাড়তে পারে। এতে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
কুড়িগ্রাম পাউবোর তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে ধরলা নদীর পানি তালুক শিমুলবাড়ী পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং ব্রহ্মপুত্র নদ নুনখাওয়া পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৬৬ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সকাল ৯টায় দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। পানি বাড়তে শুরু করায় তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চলের নিচু জমিগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে ফসলহানির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের চর জুয়ান সতরা এলাকার কৃষক আবদুস ছালাম বলেন, পানি বাড়ার কারণে চরাঞ্চলের নিচু জমিগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এতে মরিচ ও পটোলখেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর গতিয়াশাম এলাকার কৃষক ছাবেদ আলী বলেন, বাদামখেত তলিয়ে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে বাদাম তুলে নিয়েছেন। তবে পাটখেতসহ অন্যান্য সবজিখেতে ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় চরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি স্থানে নদীভাঙন শুরু হওয়ায় ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারানোর শঙ্কায় আছেন মানুষ।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, নদ-নদীর পানি বাড়া অব্যাহত থাকলেও সব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে আছে। তবে চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তিস্তার পানি আরও বেড়ে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
লালমনিরহাটে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল : তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টেও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বেলা ৩টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৬ মিটার, যা বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটারের চেয়ে ১ সেন্টিমিটার বেশি। এতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজানে ভারতে কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। তবে গত কয়েক দিন তা বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল হালকা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। ফলে জেলার পাঁচটি উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। তিস্তা চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে।
পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদীতীরবর্তী এলাকার উঁচু রাস্তাগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এসব বাঁধ চলতি বন্যায় বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি তাদের।
নদীতীরের গোবর্ধন গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে পানি বাড়া-কমা করছিল। এখন বাড়ার পরিমাণটা বেশি। চরাঞ্চলের অনেক বাড়িতে পানি উঠেছে। তারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি এলাকায় শিশু, বৃদ্ধ আর প্রতিবন্ধীদের নিয়ে চরম কষ্টে থাকতে হয়। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিয়েও আমাদের কষ্টের শেষ নেই। এর সঙ্গে থাকে সাপ-বিচ্ছুর উপদ্রব। সব মিলিয়ে আমাদের নিদ্রাহীন রাত কাটে বন্যার সময়। বন্যা যত দিন, আমাদের কষ্ট তার চেয়েও বেশি।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজানের পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি বেড়েছে। এ কারণে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে হালকা বন্যা দেখা দিতে পারে। বন্যা পরিস্থিতি সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বেলা ৩টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় এ পয়েন্টে পানির প্রবাহ বেড়েছে। তাই হালকা বন্যা দেখা দিয়েছে। উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হতে পারে।
তিস্তার ভাঙনে বিলীন ১৫ একর ফসলি জমি : রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কোলকোন্দ গ্রোয়েন বাঁধের তলদেশ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ায় বাঁধসংলগ্ন এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় ১৫ একরের বেশি আবাদি জমি।
ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তিস্তার ডান তীর রক্ষাবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে গঙ্গাচড়া উপজেলা ও রংপুর শহরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
স্থানীয় বাসিন্দা রশিদ মিয়া বলেন, ‘আজ পাঁচ দিন যাবৎ পানি উন্নয়ন বোর্ড, মেম্বার-চেয়ারম্যান এরা আইসে আর খালি দেখি দেখি যায়। এদের কোনো কাজের কাজ নাই। কালকা আসছিল, আইসা ১০০টা বস্তা দিছে, ৪৫টা বস্তা ফালাইছে আর বাকি বস্তা নিয়ে গেছে। আইজকা যেভাবে বাঁধের নিচে দিয়ে পানি ঢুকবার লাগিছে, তাতে বাড়িঘর, জায়গা-জমি সবকিছু নদীত ভাসি যায় নাকি, কে জানে। হামাক বাচ্চাকাচ্চা নিয়া রাস্তার ধারত থাকা লাগবে।’
চলতি মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে ১ নম্বর গ্রোয়েনবাঁধে চাপ পড়েছে। বাঁধের তলদেশ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে গঙ্গাচড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমি গতকাল কোলকোন্দ ইউনিয়নের গ্রোয়েনবাঁধে গিয়েছিলাম। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় সেখানে কিছু জিও ব্যাগও দেওয়া হয়েছে। বাঁধের তলদেশ দিয়ে পানি ঢোকার বিষয়টি আমার জানা নেই। এ রকম হয়ে থাকলে আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে এখনই কথা বলছি। তারা যেন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।’
কেকে/এলএ