শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব রাষ্ট্রপতির      বন্যায় ভাসছে ২০ জেলা      আ. লীগকে সক্রিয় করতে হাসিনার নতুন চাল      হরমুজে হামলা বন্ধে ইরানের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি চায় যুক্তরাষ্ট্র      আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস      ঢাকাসহ ১৬ অঞ্চলে ঝড়বৃষ্টির আভাস      চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় সেনা মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বন্যায় ভাসছে ২০ জেলা
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৬ এএম আপডেট: ১১.০৭.২০২৬ ১১:২০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বাংলাদেশের কমপক্ষে বিশটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগ, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম বোর্ডের আজকের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রামের বন্যার্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করছেন। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন সড়ক ও রেলপথ তলিয়ে গেছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীভাঙনের ফলে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে নদীতীরের হাজার হাজার পরিবার।

দেশের বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীতীরের নিম্নাঞ্চলও কোথাও কোথাও প্লাবিত হয়েছে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু কিছু স্থানের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও বন্যা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার প্রধান নদী গোমতীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

দেশের পাঁচ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর

সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও উজানের বৃষ্টিপাতের প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ৫ নদীর ৯ স্টেশনে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫টি নদীর ৯টি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী পয়েন্টে পানি যথাক্রমে ৯৫ ও ২৩ সেন্টিমিটার, মাতামুহুরী নদীর লামা ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৪৭ ও ৩২ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৮ ও ১০ সেন্টিমিটার, মনু নদীর মনু রেলওয়ে ব্রিজ ও মৌলভীবাজার পয়েন্টে ৩৫ ও ৮০ সেন্টিমিটার এবং খোয়াই নদীর বল্লা পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। এছাড়া ৫টি নদীর আরও ৯টি স্টেশন সতর্কসীমায় রয়েছে। এগুলো হলো— তিস্তা নদীর ডালিয়া (নীলফামারী), কাউনিয়া (লালমনিরহাট) ও তারাপুর (গাইবান্ধা); কুশিয়ারা নদীর শেরপুর (মৌলভীবাজার); সুরমা নদীর কানাইঘাট (সিলেট), ছাতক ও সুনামগঞ্জ; সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) এবং ছোট ফেনী নদীর কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) পয়েন্ট। গত ২৪ ঘণ্টায় উজানে সর্বোচ্চ ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে। একই সময়ে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে।

পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি স্টেশনের মধ্যে ৭৯টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, ৪৩টিতে কমেছে এবং ৫টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

চট্টগ্রাম বোর্ডে আজকের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব জেলার আজ শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সব কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাইকিং করে এলাকায় বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এক জরুরি চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ

টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কার্যত পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, ভেঙে গেছে বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ, ডুবে গেছে গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নতুন করে আলোচনায় এসেছে কক্সবাজার রেলপথ। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইন নির্মাণে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত কালভার্ট না থাকায় অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে বিল-ঝিল ও নিম্নাঞ্চলের পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থেকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারী বর্ষণের প্রবণতা বাড়ছে। তাই বড় অবকাঠামো নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি সমান গুরুত্ব না পেলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য ২০০ টন চাল, ১০ লাখ টাকা এবং প্রায় দেড় হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অতি বৃষ্টিতে বান্দরবানের জেলা সদর, লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে সড়কে পানি জমে থাকায় বান্দরবানের সঙ্গে কেরানীহাট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটিসহ সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাস সার্ভিস বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েন অনেক যাত্রী। দুর্যোগ মোকাবিলায় সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আর এ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

রাঙ্গামাটির আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ সহস্রাধিক মানুষ

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় টানা ভারী বর্ষণের পরিমাণ কিছুটা কমে আসলেও জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় প্লাবিত হওয়া গ্রামগুলোর পানি কমেনি। পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হচ্ছে, সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে আটকে পড়া বাকি সব পর্যটককে শুক্রবার সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে সাজেকে আর কোনো পর্যটক আটকে নেই।

রাঙ্গামাটি আঞ্চলিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাঙ্গামাটিতে ৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমলেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং বন্যা পরিস্থিতির কারণে এখনো জেলার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

সাজেকে আটকা পড়া পর্যটকদের সরিয়ে এনেছে সেনাবাহিনী

রাঙামাটির সাজেকে আটকা পড়া সব পর্যটককে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সরিয়ে আনা হয়েছে। গতকাল ৪১১ পর্যটককে সরিয়ে আনা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে পর্যটকদের নিয়ে আসার কার্যক্রম শুরু করে বাঘাইহাট সেনা জোন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, সাজেকে আটকা পড়া ৫৬১ জন পর্যটকের মধ্যে সেনাবাহিনীর স্কটের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার ১৫০ জনকে এবং শুক্রবার বাকি ৪১১ জনকে সরিয়ে আনা হয়েছে।

খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় কিছু কিছু এলাকা থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে। এদিকে সাজেকে আটকা থাকা পর্যটকরা সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ফিরছেন।

দীঘিনালা-মেরুং সড়কের বিভিন্ন স্থান এখনো তলিয়ে থাকায় রাঙ্গামাটির লংগদুর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ চালু হয়নি। অপরদিকে, কবাখালী এলাকার সড়ক থেকে পানি নেমে যাওয়ায় রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। গতকাল সকালে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের তত্ত্বাবধানে সাজেকে আটকে থাকা পাঁচ শতাধিক পর্যটককে নিরাপদে ফেরানো হয়েছে।

চট্টগ্রামে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলার মানুষ। লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত। অনেক স্থানে কোমর থেকে গলাসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা, ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে।

সুনামগঞ্জে বাড়ছে হাওর-নদীর পানি

টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জে বাড়ছে সুরমা নদীসহ সব নদী ও হাওরের পানি। গতকাল সকালে বৃষ্টি কম হলেও দুপুরের পর থেকে বৃষ্টিপাত আবার শুরু হয়। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলা, দুর্গাপুর এলাকায় এখনো পানি রয়েছে। এসব স্থানে বৃহস্পতিবার যান চলাচলে সমস্যা হলেও শুক্রবার ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। সড়কে পানি থাকায় ওই পথে টাঙ্গুয়ার হাওরে যাতায়াতকারী পর্যটকদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ছাড়াল তিস্তার পানি

উজানের ঢল আর ভারী বর্ষণে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ফের বিপৎসীমার ওপরে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এজন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সবকটি জলকপাট।

তিস্তার পানি বাড়া অব্যাহত থাকলে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী এবং জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত রাখা হয়েছে এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

লালমনিরহাটের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আকস্মিক এ বন্যার কারণে চরের শত শত একর জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বীজতলা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই নদীর পানি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে। সর্বশেষ রাত ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ মিটার, যা এই পয়েন্টের নির্ধারিত বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টায় পানির স্তর বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করছিল, যা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করে।

উজানের এই তীব্র পানির চাপ সামাল দিতে এবং ব্যারাজের নিরাপত্তা রক্ষার্থে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট (স্লুইস গেট) একযোগে পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়েছে।

হবিগঞ্জে ২০ গ্রাম প্লাবিত

টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদের পানি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদের দুটি প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিকভাবে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন দুর্গতরা।

হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ স্থানীয় বাসিন্দারা গবাদিপশু এবং প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে রাতেই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে মাইকিং করে প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আহ্বান জানানো হয়।

যশোরে ঘরে ঘরে পানি

টানা ১০ ঘণ্টায় রেকর্ড ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে যশোরের নিম্নাঞ্চলে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে যশোর শহর, শহরতলীসহ গোটা জেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে শহরের অধিকাংশ এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পানি প্রবেশ করেছে নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেবল বৃষ্টি নয়, এ জলাবদ্ধতার পেছনে মূল কারণ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা। শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলার কারণে ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ড্রেনের নিচে নদীর মতো পলি জমে আছে। আবর্জনার স্তূপের কারণে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারছে না। কোথাও অর্ধেক, আবার কোথাও সম্পূর্ণ ড্রেন ময়লা ও পানিতে ঠাসা। শহরের বেশ কিছু এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারেই অপরিকল্পিত।

আবহাওয়ার কারণে রাঙ্গাবালী সংলগ্ন নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। প্রবল ঢেউ ও দমকা হাওয়ার কারণে অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন ঘাটে নোঙর করে আছে। কুয়াকাটায় বাতিল হচ্ছে হোটেল বুকিং টানা বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় দেখা দিয়েছে পর্যটক খরা। বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে সাপ্তাহিক ছুটিকে ঘিরে পর্যটকের যে ঢল নামার কথা ছিল, তা দেখা যায়নি।

এদিকে অনেক পর্যটক আগাম বুকিং বাতিল করায় বিপাকে পড়েছেন আবাসিক হোটেল-মোটেল মালিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইড, অটোরিকশা চালক ও সৈকতসংলগ্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া। উত্তাল সমুদ্রের কারণে সৈকতে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। যারা কুয়াকাটায় এসেছেন, তারাও অধিকাংশ সময় আবাসিক হোটেলের কক্ষেই অবস্থান করছেন।

ফলে সৈকতজুড়ে ছিল নির্জন পরিবেশ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যেখানে সৈকতে হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে, সেখানে শুক্রবারও ছিল অনেকটাই ফাঁকা। ১৭ জেলায় ঝড়ের আশঙ্কা বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে দেশজুড়ে দাপটে রয়েছে আষাঢ়ের বৃষ্টি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও দেশে সর্বোচ্চ ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অবস্থায় দেশের ১৭ জেলায় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড় হতে পারে। সেই সঙ্গে আগামী ৫ দিনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বন্যা   ২০ জেলা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close