গত কয়েকদিন ধরেই দেশজুড়ে দুর্যোপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। বিশেষ করে টানা ভারী বর্ষণে কিছু জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ও অনেক জেলায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা। এর মধ্যে গত রোববার অতিবৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকাও। চট্টগ্রামসহ অন্যান্য আক্রান্ত জেলায়ও দুর্ভোগ বাড়ে। আবহাওয়া অফিস আরও কয়েকদিন ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এই ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল সোমবার সারা দেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় এদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এমন বিরূপ আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ছাত্রদল আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তুলেছে। তারা শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনেরও সমালোচনা করেন।
গতকাল চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এদিন সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীরা উপস্থিত হন। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রে হাঁটু ও কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন পরীক্ষার্থীরা।
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তায় কোমরসমান পানি। ভেতরে বারান্দায়ও পানি উঠেছে। তাছাড়া কেন্দ্রের প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার এলাকার রাস্তায়ও ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোমরসমান পানি পেরোতে শিক্ষার্থীদের পোশাক ভিজে গেছে। ভেজা পোশাক নিয়েই তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়েছেন তারা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজসহ জেলা শহরের অধিকাংশ কেন্দ্রের চিত্রই এমন। পাশাপাশি নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রেও পানি জমে যায়।
বিরূপ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়াকে শিক্ষামন্ত্রণালয় ও বোর্ডে দায়িত্বহীনতা বলে মন্তব্য করেছে অভিভাবকরা। এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক গণমাধ্যমকে বলেন, ভেজা পোশাক পরে কোনো শিক্ষার্থী তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে পারে? এগুলো কি সরকার, মন্ত্রীদের চোখে পড়ে না? তারা কি ভিন্নগ্রহের মানুষ?
অভিভাবকরা বলেন, গত দুটি পরীক্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে, পানিতে অনেকটা সাঁতরে কেন্দ্রে যাচ্ছে। অথচ কারও কোনো কথা নেই। মনে হচ্ছে দেশে কোনো সরকার নেই। জনগণের প্রতি, পরীক্ষার্থীদের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা :
দুযোর্গপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন নেটিজেনরা। পাশাপাশি ট্রল করে এবং মিমস বানিয়ে মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন তারা।
সাদিকুর রহমান সাদাব নামে একজন চিকিৎসক এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বারবার সবাই অনুরোধ জানাচ্ছিলাম এইচএসসি এক্সাম পেছাতে। এই আবহাওয়ায় ঢাবি-বুয়েটের ক্লাস, এক্সাম অফ বা অনলাইনে। মিলন সাহেব কাল রাত ৫টায় বললো সে আবহাওয়া দেখে জানাবে এক্সামের বিষয়ে, ৭টায় নোটিস দিল এক্সাম হবে, আবহাওয়া নাকি ভালো। সারারাত এবং সারা সকাল বৃষ্টি হচ্ছে। হাঁটুপানিতে ভিজতে ভিজতে বাচ্চারা এক্সাম দিতে গেছে, আজ অনেক বাচ্চার এক্সাম মিস হবে। অনেকে পানিতে পড়ে যাচ্ছে, ভিজে যাচ্ছে ড্রেস, অ্যাডমিট কার্ড। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে আজ এক্সাম দিচ্ছে বাচ্চারা। অমানবিকতার চূড়ান্ত লেভেল দেখলো বাচ্চারা। ১০ লাখ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক গালি দিতে দিতে আজ এক্সাম দিতে যাচ্ছে, গালি দিতে দিতে বের হবে। ফিজিক্স পরীক্ষা খারাপ হয়ে বাচ্চারা চলে যাবে ডিপ্রেশনে। অনেকের স্বপ্ন শেষ করে দিলো আজকে নিজের গোঁয়ারতুমির জন্য।’
এ বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে অনুকূল আবহাওয়ার সময়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্যোগকালে শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনাও থাকা উচিত।
দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ড :
দুর্যোগে এমন ভোগান্তিতেও পরীক্ষা গ্রহণ ও তা নিয়ে সমালোচনা হলেও দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। তারা বলছে, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। ডিসি ও ইউএনওরা যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, তাতে পরীক্ষা স্থগিতের পরামর্শ বা সুপারিশ করা হয়নি।
আন্তঃশিক্ষা শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসক বা স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশ বা পরামর্শে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। চট্টগ্রাম বাদে সবগুলো জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিরূপ আবহাওয়ার কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল দলটির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা যায়।
এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে সারা দেশে টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমন এক দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও গত ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা দেশব্যাপী (চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ব্যতীত) অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য বা যুক্তিসঙ্গত নয়। পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিতের দাবি জানিয়ে দলটি বলেছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তের প্রতি গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানাচ্ছে।
একই সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষা বোর্ডের অধীন চলমান পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিতের জোর দাবি জানাচ্ছে।
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাসহ অন্যান্য বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি মানবিক বিবেচনায় এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
কেকে/ এমএস