মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা, দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়      হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনা, ইরানে রাতভর মার্কিন হামলা      স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      
খোলাকাগজ স্পেশাল
অপরিকল্পিত নগরায়ণে দুর্বিষহ জলজট
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৮:৫৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আকাশে কালো মেঘ জমলেই ঢাকাবাসীর মনে নেমে আসে শঙ্কা। ঘণ্টাখানেকের ভারী বৃষ্টিই রাজধানীর স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান পানি। বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল, বিকল হয় গাড়ি, সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী সবাইকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ।

গত রোববার টানা বৃষ্টিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানির নিচে তলিয়ে যায় বিভিন্ন মোড়, নিম্নাঞ্চল ও আবাসিক এলাকা। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে যানবাহন, কোথাও ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন বিকল হয়ে পড়ে। গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি।

এদিকে রোববারের বৃষ্টিতে একদিনে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে এর সঠিক পরিসংখ্যান না মিললেও কেউ কেউ বলছেন, ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, জলাবদ্ধতা ও ভারী বৃষ্টি থাকলে ঢাকায় দিনে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার বেচাকেনা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, আর সারাদেশে দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বিক্রি কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট কেবল অতিবৃষ্টির নয়। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-জলাশয় দখল, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনার ফল। যার ফলে বৃষ্টির পানি নদী-খালে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ প্রায় হারিয়ে যাওয়ায় রাজধানী বারবার জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে।

তাদের মতে একসময় ঢাকার অসংখ্য খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক নালা দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে নেমে যেত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সেই প্রবাহপথ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। একইসঙ্গে কার্যকর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে না ওঠায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি আটকে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই চিত্র দেখা গেলেও কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না এমন প্রশ্ন নগরবাসীরও। তাদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে সুফল মিলছে না। খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেন পরিষ্কার কিংবা প্রকল্পের ঘোষণা থাকলেও বর্ষা এলেই রাজধানী ডুবে যায়। কিন্তু নাগরিকদের এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। 

তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও ভরাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে। এ সমস্যা নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানান উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি।  

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এখানে ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস। অথচ ওয়ার্ডগুলোর পানি নিষ্কাশনে মাত্র চারটি আউটলেট আছে। এর মধ্যে মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। 

ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গায় যায় পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি। গ্রিন রোড, তল্লাবাগ ও পান্থপথ এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে যায়। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডি এলাকার কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশন করা হয়। ফলে ঢাকায় টানা এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে ওই পানি একসঙ্গে মাত্র চারটি আউটলেট দিয়ে নিষ্কাশন সম্ভব নয়। 

ঢাকার বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৫৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নগরীর বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ১৭ দশমিক ৭ মিলিমিটার। বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাত ও দৈনিক সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা সামান্য কমলেও বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত প্রকৃতি এবং তীব্র বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। ঢাকায় একদিনে সর্বোচ্চ ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। একই সময়ে দুদিনে সর্বোচ্চ ৪৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫৩ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ৪৭ বছরে মাত্র তিনবার একদিনে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। অথচ ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র ২৪ বছরে একই মাত্রার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় তিনবার। ১৯৮৮ সালে ওই জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার ২৬টি খালের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসাকে দেয় সরকার। তারপরও নগরের খালগুলো ক্রমেই বেদখল হয়ে যায়। অনেক খাল ভরাট করে গড়ে ওঠে বহুতল ভবন। পরিস্থিতির বেগতিক দেখে ২০২১ সালের ওই খালগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে ওয়াসা। কিন্তু এখন পর্যন্ত খালগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি। ফলে বৃষ্টি হলে শহরের পানি বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। 

জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব গণমাধ্যমকে বলেন, আগে ঢাকার ভেতর অসংখ্য জলাশয় ছিল। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে একে একে তা দখল, ভরাট হয়ে গেছে। এখন বৃষ্টির পানি যাওয়ার জায়গা নেই। আবার গত ২০ বছরের মধ্যে ১৬ বছর ঢাকার খালগুলোর ওয়াসার অধীনে ছিল; পরে চার বছর সিটি করপোরেশনের কাছে। তারা জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্লু নেটওয়ার্কটা তৈরি করেনি। ওপর থেকে রহমতের বৃষ্টি পড়বে। এটা গড়িয়ে গড়িয়ে খাল হয়ে নদীতে যাবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পানি বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। তাই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে ব্লু নেটওয়ার্ক তৈরির বিকল্প নেই। 

গত রোববারের বৃষ্টিতে ডিএনসিসির শতাধিক এলাকার সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। গতকাল সোমবার বনানীসহ ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। কিন্তু ড্রেন ও ম্যানহলের মুখ পরিষ্কার ছাড়া সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। 

ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর গণমাধ্যমেকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন-নালা পরিষ্কারসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে ডিএনসিসি। জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে রোববার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ডিএনসিসি খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কার এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ করছে। 

অপরদিকে ঢাকায় জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ পলিথিন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, পলিথিনের ব্যবহার কমানো না গেলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। গতকাল সকালে নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। 

প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, সেসব স্থানে পানি চলাচলের পথ পলিথিনে আটকে ছিল। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ পলিথিন অপসারণ করেছেন। তাই পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
 
তিনি আরও বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। রাজধানীর খালগুলোকে আগের অবস্থায় পুনরুদ্ধার করা গেলে এ সংকট অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি, ঢাকার পানি দ্রুত বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  অপরিকল্পিত নগরায়ণ   দুর্বিষহ জলজট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close