পর্দা নেমেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালের। এখন বাকি কেবল শেষ চার দলের লড়াই। এবারের আসরে বিশ্ব ফুটবলের চার পরাশক্তি এবং ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দলই জায়গা করে নিয়েছে সেমিফাইনালে।
ডালাসে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম সেমিফাইনাল, যেখানে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ফ্রান্স ও স্পেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে শিরোপার দৌড়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে মাঠে নামবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড।
ফাইনালে ওঠার এই মহারণকে সামনে রেখে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন চার দলের একাধিক তারকা ফুটবলার। নিজেদের প্রস্তুতি, প্রতিপক্ষ, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তারা।
আর্জেন্টিনা: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবার খেলতে মুখিয়ে মেসি
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির জন্য এই সেমিফাইনাল বিশেষ এক উপলক্ষ। ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এবারই প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছেন। ম্যাচটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মেসি বলেন, এটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হতে চলেছে।
মেসির ভাষায়, ইংল্যান্ড সবসময়ই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো বড় মঞ্চে এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে পারাটা তার কাছে দারুণ রোমাঞ্চকর। তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দলের এই লড়াই দর্শকদের জন্য অসাধারণ একটি ম্যাচ উপহার দেবে।
অন্যদিকে কোয়ার্টার-ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে দূরপাল্লার দুর্দান্ত গোল করে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তোলা হুলিয়ান আলভারেস আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তিনি বলেন, টুর্নামেন্ট যত এগোচ্ছে, নিজের খেলায় তত বেশি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন। সেমিফাইনালে আরও ভালো পারফরম্যান্স করার প্রত্যাশা রয়েছে তার।
আলভারেস জানান, ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের জয়ই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে একজন স্ট্রাইকার হিসেবে গোল করে দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে পারলে সেটি সবসময়ই বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়।
ইংল্যান্ড: এবার ট্রফি জয়ের লক্ষ্য কেইনের
ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনের চোখ এখন শুধুই শিরোপার দিকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেললেও ট্রফির দেখা পায়নি থ্রি লায়ন্সরা। এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চান কেইন।
তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ড জাতীয় দল বর্তমানে একটি সফল সময় পার করছে। তবে এই যাত্রাকে স্মরণীয় করে তুলতে এখন প্রয়োজন শেষ ধাপটি অতিক্রম করা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পুরো দল প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করছে এবং দেশের জার্সির মর্যাদা রক্ষায় নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিচ্ছে।’
চলতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অন্যতম ভরসার নাম জুড বেলিংহামও নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘এবারের বিশ্বকাপে যা ঘটছে, তা অনেকটা স্বপ্নের মতো। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস সবসময়ই ছিল, কিন্তু এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কথা কল্পনাও করেননি।’
রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকার মতে, দলের জয়ে অবদান রাখতে পারাটা দারুণ অনুভূতি। তবে তার চেয়েও বেশি আনন্দের বিষয় হলো, কঠিন পরিস্থিতিতেও সতীর্থরা যেভাবে একসঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, সেটি তাকে গর্বিত করে।
ফ্রান্স: ট্রফি না জেতা পর্যন্ত থামতে রাজি নন এমবাপ্পে
টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য কেবল শিরোপা। সেমিফাইনালের আগে তিনি বলেন, ‘ট্রফি জয়ের আগে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।’
এমবাপ্পের মতে, বিশ্বকাপ জয়ের আগ পর্যন্ত ফ্রান্সের পুরো দলকে একই মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। নিজেদের অপরাজিত এবং সেরা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এখনও অনেক কিছু প্রমাণ করা বাকি রয়েছে।
ফ্রান্সের আরেক তারকা উসমান দেম্বেলেও দলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট। ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলে নিজের দায়িত্ব পালন করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। টুর্নামেন্ট যত এগোচ্ছে, ততই তার আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ছে।’
দেম্বেলে আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলের সাফল্যই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দলের প্রয়োজনেই তিনি নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।’
স্পেন: আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর ইয়ামাল
স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল সেমিফাইনালের আগে আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের মতে, এবারের বিশ্বকাপের সেরা দুই দলই সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে। তবে ফ্রান্সকে নিয়ে তাদের কোনো ভয় নেই।
ইয়ামাল বলেন, ‘টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই অনেকে এই ম্যাচটির অপেক্ষায় ছিলেন। তার বিশ্বাস, ফ্রান্সকে হারানোর সামর্থ্য যদি কোনো দলের থাকে, তাহলে সেটি স্পেন।’
স্পেনের মাঝমাঠের অন্যতম স্তম্ভ রদ্রিও মনে করছেন, ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটিই হবে তাদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তবে তিনি দলের সামর্থ্য নিয়ে আশাবাদী।
রদ্রি বলেন, ‘ফ্রান্স নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি দল। কিন্তু স্পেনও আত্মবিশ্বাসী এবং জয় পাওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার মতে, নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব।’
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে চার পরাশক্তিই এখন শেষ প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। মাঠের লড়াইয়ে কে এগিয়ে যাবে, সেটি জানা যাবে দুই সেমিফাইনাল শেষে। তবে ম্যাচ শুরুর আগেই চার দলের তারকাদের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, কেউই প্রতিপক্ষকে এক চুল পরিমাণও ছাড় দিতে রাজি নয়।
কেকে/এলএ