টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের দিকে একদল শিক্ষার্থী শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে সায়েন্স ল্যাবে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা সংসদ ভবন এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এদিকে, এ আন্দোলনকে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের লোকজন নানা গুজব ছড়াচ্ছে। এ ছাড়া জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন পেজ থেকেও বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়ানো হচ্ছে।
এ ছাড়া রাজধানীর উত্তরায় জমায়েত হওয়া শিক্ষার্থীদের হাতে দেখা গেছে ওয়াকিটকির মতো ডিভাইস। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে পুঁজি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা ও দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরূপ আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ায় দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আর এই ক্ষোভকে পুঁজি করে সরকারবিরোধী বিভিন্ন মহল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামার উসকানি দেয়। এই উসকানিতে রাজধানীসহ কয়েকটি জেলায় কিছু শিক্ষার্থী রাস্তায় নামে। কিন্তু তাদের আড়ালে রয়েছে পলাতক ফ্যাসিস্টচক্র। তারা সামাজিক মাধ্যমে নানা গুজব ছড়াচ্ছে। তাদের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে পুঁজি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা।
তারা আরও বলছেন, সম্প্রতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। তার আগে নানাভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে ফ্যাসিস্টচক্র। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য বিরোধী দলের লোকজনও সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ছড়াচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়।
শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যু যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট ও পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে আন্দোলনের গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী ছাড়া বহিরাগতরা সেখানে ঢুকে আন্দোলনের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এমন কয়েকজনকে শনাক্ত করেছেন বলে জানা গেছে।
সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা শিক্ষার্থীদের : তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভের একপর্যায়ে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটা করে। সকাল থেকে সারা দিন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেন এই শিক্ষার্থীরা। জাতীয় সংসদে অধিবেশন চলার মধ্যে সংসদের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন তারা।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা ‘দফা এক, দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফাহমিদ খান সাব্বির বলেন, ‘আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া এই স্থান থেকে যাব না।’
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রথমে পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিপেটা করে। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান ফটক থেকে আসাদগেট পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে গত সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও কঠিন প্রশ্ন করার অভিযোগও তুলেছেন। অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।
সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে দিলে বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান। সেখান থেকে ফিরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন।
সায়েন্স ল্যাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো দেখার আশ্বাস দিয়ে তাদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান শিক্ষামন্ত্রী। এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার পর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। সেগুলো হলো—অনতিবিলম্বে আজ সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে; যারা ১৩ জুলাই অস্বস্তিকর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং যারা করেনি, সব শিক্ষার্থীর আবার পরীক্ষা নিতে হবে; এবং আগামীকালের অর্থাৎ ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে, পরীক্ষার নতুন রুটিন প্রকাশ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে।
এদিকে, বন্যাকবলিত এলাকায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটক খুলে ফেলেছেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই নিহত হওয়ার মিথ্যা খবর, পুরোনো ভিডিও ও ছবি এবং রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া বক্তব্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চলছে। গতকাল ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট-এর একাধিক যাচাই প্রতিবেদনে এসব দাবিকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বলে শনাক্ত করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটি বলছে, আন্দোলন ঘিরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থির করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দ্য ডিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কয়েকটি ফেসবুক পেজ থেকে দাবি করা হয়, আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। তবে যাচাই করে এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি।
আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষামন্ত্রী, বিএনপি এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নামে একের পর এক ভুয়া ফটোকার্ডও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ফটোকার্ডে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য বসিয়ে সেগুলোকে সত্য বলে প্রচার করা হলেও এসব বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
শুধু ভুয়া বক্তব্যই নয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার দাবি তুলে পুরোনো ছবিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা গেছে, যে ছবিটি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বলে ছড়ানো হচ্ছে, সেটি আসলে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের সময় তোলা। বর্তমান এইচএসসি আন্দোলনের সঙ্গে ওই ছবির কোনো সম্পর্ক নেই।
নতুন কর্মসূচির কথা জানিয়ে সড়ক ছাড়লেন আন্দোলনকারীরা : গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একজন আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেন সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজ। তিনি বলছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে। তবে আজকের আন্দোলন এ পর্যন্ত চলবে। এখানেই স্থগিত করা হলো। পরবর্তী কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নেব, তারপর জানিয়ে দেব আগামীকালের কর্মসূচি। হয়তো সংসদ ভবন, নতুবা শিক্ষাভবন অভিমুখে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।’
কেকে/এলএ