বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: আন্দোলনের শঙ্কায় পরীক্ষা শেষে সন্তানদের নিতে কেন্দ্রে অভিভাবকরা      শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর একটি করে গাছ লাগানোর আহবান প্রধানমন্ত্রীর      মিলেমিশে চলছে চাঁদাবাজি      ঝুঁকি নিয়ে বসবাস      ষড়যন্ত্রের ফাঁদে শিক্ষার্থীরা      শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে রাতেও চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন      বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ শিক্ষামন্ত্রীর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বন্যা ও জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক অভিঘাত
মো. মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:১১ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ভূ-প্রাকৃতিক গঠন ও জলবায়ুগত অবস্থানের কারণে ঐতিহাসিকভাবেই বন্যাপ্রবণ। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা, যা মূলত ত্রুটিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের এক মানবসৃষ্ট ফসল। বন্যা যেখানে নদী উপচে বা প্রবল বর্ষণে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, সেখানে জলাবদ্ধতা হলো ভূ-পৃষ্ঠের পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পারার একটি কৃত্রিম সংকট। এ দুই দুর্যোগের নেপথ্য কারণ, এর গভীর অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য সাময়িক প্রতিকারের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত প্রতিরোধ কতটা জরুরি, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বন্যার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এর পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় উপাদানেরই ভূমিকা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উজানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং পার্বত্য অঞ্চল থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল নদীগুলোর স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে। একই সঙ্গে নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করে। তবে এ প্রাকৃতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ। উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নির্বিচারে বন উজাড় এবং প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি শোষণের প্রধান উৎস অর্থাৎ জলাভূমিগুলো ভরাট করার ফলে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে, শহরাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সম্পূর্ণরূপেই একটি সুপরিকল্পিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবের ফল। প্রাকৃতিক খাল, ডোবা ও নিচু জমি ভরাট করে বহুতল ভবন ও কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণের ফলে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে যাওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত এবং যেটুকু আছে, তাও সঠিক নকশার অভাবে অকার্যকর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিকদের অসচেতনতা। প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে সুয়ারেজ লাইনগুলো বন্ধ হয়ে পানি নিষ্কাশন স্থবির হয়ে পড়ে।

অর্থনৈতিক অভিঘাতের স্বরূপ

বন্যা ও জলাবদ্ধতা শুধু জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে না, বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জলবায়ু ঝুঁকি সূচক এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বন্যায় বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার (১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা) সমমূল্যের ক্ষতি হয়, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ। চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ক্ষেত্রে সামগ্রিক ক্ষতির এ পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সরকারি হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধু বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের বন্যায় দেশের পূর্বাঞ্চলেই ক্ষতি হয়েছে ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকার বেশি। এ অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশই বহন করতে হয় কৃষি খাতকে, যেখানে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে যায়। পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও বাঁধ ধ্বংস হওয়ার ফলে সরকারের উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ শুধু সংস্কারকাজেই ব্যয় করতে হয়।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও সঠিক কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে এর তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। বন্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কাঠামোগত স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। এর মধ্যে নদীর দুই তীরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি এবং পানি ধারণের জন্য জলাশয় খনন অন্যতম। সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের ঘরবাড়ির ভিটা বন্যার স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে উঁচুতে নির্মাণ করা এবং আপৎকালীন শুকনো খাবার ও জরুরি ওষুধ মজুত রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সমন্বয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হতে হবে, যেন ড্রেন ও নালা সচল থাকে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শহরের প্রাকৃতিক খালগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করে খনন করা, প্রশস্ত বক্স কালভার্ট তৈরি করা এবং নিচু এলাকাগুলোতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শহরের মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের সময় পানি নিষ্কাশনের পথ ও মাটির পানি শোষণক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা।

দুর্যোগের সময় জানমালের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া দরকার। বন্যার আগাম বার্তা পাওয়ামাত্রই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও গবাদিপশুকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের সক্ষমতা থাকতে হবে। জীবন রক্ষার্থে গ্রামীণ ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করা এবং লাইফ জ্যাকেটের মতো সুরক্ষাসামগ্রী সহজলভ্য করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বন্যাপরবর্তী সময়ে পানিবাহিত মহামারি প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতকরণ এবং সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে কার্বলিক অ্যাসিডের ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে, শহরের জলাবদ্ধ নোংরা পানি থেকে মানবদেহে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানো রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং আক্রান্ত স্থান শুকনো ও সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো আবশ্যক।

স্থায়ী টেকসই সমাধান ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

বন্যা ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনে সরকারের ভূমিকা হতে হবে সুদূরপ্রসারী ও ত্রিস্তরবিশিষ্ট।

দুর্যোগের পানি নেমে যাওয়ার পরপরই দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত জনজীবন ও অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও খামার খাতে দ্রুত প্রণোদনা, বিনামূল্যে উন্নত জাতের বীজ, সার এবং সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ করতে হবে, যাতে কৃষকেরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। একই সঙ্গে ভেঙে যাওয়া সড়ক, কালভার্ট, সেতু এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করে যোগাযোগব্যবস্থা সচল করতে হবে। এ ছাড়া নদীভাঙন ও পাহাড়ধসের শিকার হয়ে ভিটেমাটি হারানো গৃহহীন পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে টেকসই ও নিরাপদ স্থানে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সরকারের এ ধাপের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বন্যা ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও আইনগত সংস্কার। এর প্রথম পদক্ষেপ হলো দেশের নদী, অভ্যন্তরীণ খাল এবং প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলো থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে নিয়মিত ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং বা খনন কর্মসূচি চালু রাখা। জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে, যার আওতায় ভবিষ্যতের জাতীয় সড়ক ও রেলপথের উচ্চতা প্রমিত মাত্রার চেয়ে উঁচুতে নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের কূটনৈতিক সমাধান, দেশের অভ্যন্তরে সুষম পানি ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক স্লুইসগেট ও ওয়াটার রিজার্ভার (জলাধার) নির্মাণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার মতো কাঠামোগত নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সাময়িক ত্রাণের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনাই বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে টেকসই। এ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত উন্নয়ন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনগণের সচেতন প্রয়াসের একটি সমন্বিত রূপরেখা বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

লেখক : সামাজিক বৈষম্য ও উন্নয়ন বিশ্লেষক

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বন্যা   জলাবদ্ধতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close