শ্রীমঙ্গলে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে টানা তিন দিনের অভিযানে উপজেলা প্রশাসন প্রায় ৮ হাজার ৯০০ ঘনফুট বালু, একটি বালুভর্তি ট্রাক, একটি এক্সক্যাভেটর, পাঁচটি বালু উত্তোলনযন্ত্র এবং প্রায় এক হাজার ফুট পাইপ জব্দ করেছে। সর্বশেষ অভিযানে একটি নিয়মিত মামলাও হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় এবং প্রশাসনের সক্রিয়তার পরিচায়ক। কিন্তু একই সঙ্গে এমন একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে, যার সন্তোষজনক উত্তর আজও মিলছে না বছরের পর বছর ধরে চলা অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে যাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, তারা কেন প্রতিবারই আইনের নাগালের বাইরে থেকে যান?
ঘটনাপ্রবাহ বলছে, শ্রীমঙ্গলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়াগুলো থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হয়, বালু ও যন্ত্রপাতি জব্দ হয়, মামলা হয়, কখনো শ্রমিক, ট্রাকচালক বা তাদের সহকারীরা গ্রেপ্তার হন। এরপর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই একই চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে, সমস্যার মূল উৎসে এখনো কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
অবৈধ বালু উত্তোলন কোনো তাৎক্ষণিক বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম। হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন, এক্সক্যাভেটর পরিচালনা, শত শত ফুট পাইপ স্থাপন, ট্রাকে পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ সবকিছুই পরিকল্পিত সমন্বয় ও অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে তদন্তের লক্ষ্য কেবল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পেছনের অর্থায়ন, মালিকানা, পরিবহনব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য সংগঠকদের চিহ্নিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক তিন দিনের অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বিপুল পরিমাণ আলামত জব্দ হলেও কোনো অভিযুক্তকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা যায়নি। এমন ঘটনা একবার নয়, বারবার ঘটছে। ফলে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে অভিযানের তথ্য কি কোনোভাবে আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে যায়? নাকি অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্র প্রশাসনিক তৎপরতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে? এ ধরনের প্রশ্নের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। তবে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রশাসনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার বিষয় হওয়া উচিত। জনমনে তৈরি হওয়া এই সংশয় দূর করার দায়িত্ব প্রশাসনেরই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগও একই ধরনের। তাদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনের মুখোমুখি হন শ্রমিক, ট্রাকচালক বা সহকারীরা। অথচ যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়ন, পরিচালনা বা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত। তবে তদন্ত যদি ধারাবাহিকভাবে মূল পরিকল্পনাকারীদের পর্যন্ত না পৌঁছায়, তাহলে মানুষের মনে আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে জনঅসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দৈনিক ইনকিলাব-এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মো. আনোয়ার হোসেন জসিম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘শ্রীমঙ্গলে যে কর্মকর্তা বালুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, শ্রীমঙ্গলের জনগণ সেই যুদ্ধের দৃশ্যমান প্রতিফলন চায়। আর কত প্রাণ গেলে বালু উত্তোলন বন্ধ হবে?’ এ বক্তব্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং দৃশ্যমান ও স্থায়ী ফলাফলের প্রতি মানুষের প্রত্যাশারই বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের তদবিরের সঙ্গে একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক জড়িত। তবে তিনি কোনো নাম উল্লেখ করেননি এবং দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণও প্রকাশ করেননি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো তদন্তের ফলাফল জানানো হয়নি। ফলে এ ধরনের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও যদি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান না হয়, তাহলে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।
অবৈধ বালু উত্তোলনের ক্ষতি এখন আর শুধু পরিবেশগত নয়; এটি জননিরাপত্তারও বিষয়। নির্বিচারে বালু উত্তোলনে পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিজমি গভীর খাদে পরিণত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতে বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় একাধিক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এ সমস্যাকে শুধু অবৈধ সম্পদ আহরণের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি আইনের শাসন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জননিরাপত্তার সম্মিলিত সংকট।
প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবেই মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু একটি অভিযানের সাফল্য জব্দ হওয়া বালু বা যন্ত্রপাতির পরিমাণ দিয়ে নয়; বরং অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমেছে কি না, মূল পরিকল্পনাকারীরা আইনের আওতায় এসেছে কি না এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে কি না এসব সূচক দিয়ে মূল্যায়ন করা অধিক যৌক্তিক।
এখন প্রয়োজন কৌশলগত পরিবর্তনের। শুধু ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের পুরো অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনতে হবে। অর্থের উৎস, যন্ত্রপাতির মালিকানা, পরিবহনব্যবস্থা, ক্রেতা এবং সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি উভয়ই বাড়বে।
শ্রীমঙ্গলের মানুষ নতুন কোনো অভিযানের ঘোষণা শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় আইনের কার্যকর প্রয়োগ। কারণ রাষ্ট্রের সক্ষমতা কেবল বালু, ট্রাক বা এক্সক্যাভেটর জব্দ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তি তিনি শ্রমিক, চালক, অর্থদাতা, সংগঠক কিংবা প্রভাবশালী যেই হোন না কেন সমানভাবে আইনের আওতায় আসবেন। আইনের এই সমতা নিশ্চিত করা গেলে শুধু অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণই নয়, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও আরও সুদৃঢ় হবে।
লেখক: কলামিস্ট
কেকে/ এমএস