গত ছয় মাসে দেশে অন্তত সাড়ে তিন হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে বলে জানিয়েছে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান মুন এলার্ট। এই সংখ্যা কোনো বিচ্ছিন্ন পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার একটি গভীর ফাটলের প্রতিফলন। আমরা মনে করি, এখনই সময় সরকারের জন্য কথায় নয়, নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি এসেছে খোদ পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের একজন কর্মকর্তা স্পষ্ট করেই বলেছেন, শিশু নিখোঁজের আলাদা কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। যে সমস্যার জন্য আলাদা তথ্যভাণ্ডারই নেই, তার জন্য পরিকল্পিত নীতি প্রণয়ন কীভাবে সম্ভব? এই ফাঁকই আমাদের প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি সুপারিশের ভিত্তি।
পল্লবীর শিশু ইব্রাহিমের ঘটনা এখানে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে আসা দরকার। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মামলাটি থানা থেকে গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তরিত হয়ে আটকে আছে, অথচ সন্দেহভাজন বাড়িওয়ালাকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতা প্রমাণ করে, আমাদের তদন্ত-কাঠামো এখতিয়ারগত জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধীরগতিতে আটকা পড়ে আছে আর এই সময়ক্ষেপণের সুযোগেই অপরাধী চক্র নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, শিশু নিখোঁজের প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে সিদ্ধান্তমূলক। অথচ সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক দ্বিধা বা ভুল ধারণার কারণে অনেক পরিবার দেরিতে থানায় যায়। এই বিলম্বের সুযোগেই মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম বা যৌন নির্যাতনের নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে। সীমান্তবর্তী এলাকা, বড় শহর ও পরিবহন কেন্দ্রগুলো যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, তা প্রশাসনও স্বীকার করে কিন্তু স্বীকারোক্তির বাইরে সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধ-পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
মুন এলার্টের মতো উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে সত্যিকারের ফল দিয়েছে মিরপুরে মাত্র ২৩ ঘণ্টায় একটি শিশুর উদ্ধার তার প্রমাণ। কিন্তু একটি বেসরকারি বা আধা-সরকারি উদ্যোগের সাফল্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানো যায় না। থানা, ব্যাংকের ডিজিটাল ডিসপ্লে, পরিবহন কেন্দ্র ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনো গড়ে ওঠেনি বলে খোদ সংশ্লিষ্টরাই স্বীকার করছেন। এই সমন্বয়হীনতা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কোনো একক সংস্থার নয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো পৃথক জাতীয় তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশু নিখোঁজের জন্য একটি কেন্দ্রীভূত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করতে হবে, যা প্রতিটি থানার সঙ্গে রিয়েল-টাইমে সংযুক্ত থাকবে এবং নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করবে। গোল্ডেন আওয়ার প্রোটোকল বাধ্যতামূলক করতে হবে। জিডি দায়েরের সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত শুরুর নির্দেশনা জারি করতে হবে, যাতে থানা-বদল বা এখতিয়ার-জটিলতায় মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়।
মুন এলার্টকে জাতীয় অবকাঠামোর অংশ করার কথা ভাবা যেতে পারে। সব থানা, পরিবহন কেন্দ্র, ব্যাংক ডিজিটাল ডিসপ্লে ও গণমাধ্যমের সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মের সংযোগ বাধ্যতামূলক করে একে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সতর্কতা ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মানবপাচার বা শিশু নির্যাতনে জড়িত সন্দেহভাজনদের তদন্তে যেন কোনো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি সেল গঠন করতে হবে।
সীমান্ত ও পরিবহন কেন্দ্রে বিশেষ ইউনিট মোতায়েন করুন। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও বড় পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষিত বিশেষ প্রতিক্রিয়া ইউনিট নিয়োগ দিতে হবে। শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা কেবল প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলকও হবে।
শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা একটি পরিবারের কাছে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়। রাষ্ট্র যদি এই সংকটকে কেবল আমলাতান্ত্রিক ফাইল বা মৌসুমি উদ্বেগ হিসেবে দেখে, তবে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিশু সুরক্ষা কোনো ঐচ্ছিক অগ্রাধিকার নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্বগত দায়িত্ব।
কেকে/ এমএস