মৌলভীবাজার জেলার মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে এবং পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩১টি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও সর্বত্র এখন ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন স্পষ্ট। বসতঘর, সড়ক, সেতু, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো পরিবার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রশাসনের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৩২৫ জন হলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা অর্ধলক্ষেরও বেশি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ৩ হাজার ৯৩২টি কাঁচা ও আধাপাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৯৩টি সম্পূর্ণ এবং ১ হাজার ৪৩৯টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানিয়েছে, বন্যায় ৮৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার সড়ক, চারটি সেতু-কালভার্ট এবং দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও মেরামতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছর জেলায় ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ করা হয়। এর মধ্যে বন্যায় প্রায় ২৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিন হাজার ৭৯ হেক্টর আমনের বীজতলার আবাদের মধ্যে ৮৬.৫০ হেক্টর ও ২৩৬ হেক্টর সবজির মধ্যে ৮৬.৫০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৮ হাজার ৫৩০ আউস হেক্টর আবাদের মধ্যে ২৪৮ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২৩৬ হেক্টর খরিফ-২ সবজি আবাদের মধ্যে ৬৪.৫০ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বন্যার পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী না হওয়ায় কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হয়েছে। পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
জেলা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কার্যালয় জানিয়েছে, মাছের পুকুর ও ফিশারি ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুর খামারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফারুক আহমদ বলেন, আমি গতকাল মৌলভীবাজারে যোগদান করেছি। প্রাথমিকভাবে বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি এখন পর্যন্ত সড়ক, কালভার্ট ও সেতুর যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামত এবং পুনঃনির্মাণে অন্তত ২৮ কোটি টাকা লাগবে। তবে পুরো ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জানতে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া বলেন, পানিবন্দি ৫ উপজেলায় এক হাজার ৮৩৪টি পরিবারের মধ্যে ইতোমধ্যে খাদ্য ও নগদ সহায়তা করা হয়েছে। চলমান দুর্যোগে ব্যয়ের পরিমাণ নগদ ত্রাণ সহায়তায় ৭,৫০,০০০ টাকা, ১৪০.০০ মেট্টিক টন চাল ও ১৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার। এছাড়া গৃহ নির্মাণে জন্য ৯ লক্ষ টাকা, ৩০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ১ হাজার ৭৫০ পেকেট শুকনো ও অন্যান্য খাবার, ২০০ মেট্টিক টন চাল, নগদ ১০ লক্ষ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলিদ বলেন, মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। চলতি সপ্তাহেই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হবে।
কেকে/ এমএস