শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: মুক্তাগাছায় শিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলা ও লুটপাট      অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন      হত্যার শিকার হচ্ছেন বিএনপি নেতারা      সর্বনাশা ফাঁদে তারুণরা      বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদারের আশ্বাস ইউএনএফপি’র      চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত      ইরানের বান্দার-ই খামির সেতুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নিহত ৭      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ধ্বংসের ঝুঁকিতে ঢাকা
ভূমিকম্পের ক্ষতি হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ নিন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

ঢাকা শহরের মাটির নিচে একটি নীরব ঘড়ি টিকটিক করছে। ভূতাত্ত্বিকদের হিসাব বলছে, তিনশ থেকে পাঁচশ বছরের যে ভূমিকম্প-চক্র রাজধানীর ভাগ্য নির্ধারণ করে, তা এরই মধ্যে পূর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ সাত থেকে সাড়ে সাত মাত্রার একটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প যে কোনো মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে আজ, কাল, কিংবা আগামী দশকে। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প বিশ্ববাসীর মনে যে উদ্বেগ জাগিয়েছে, ঢাকাবাসীর জন্য তা নিছক দূরের খবর নয়; বরং আয়নার মতো নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখার সুযোগ।

গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, তাতে প্রাণ গেছে দশজনের, আহত হয়েছেন শত শত মানুষ, হেলে পড়েছে অসংখ্য ভবন। ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের ছোট কম্পন আসলে মাটির গভীরে জমে থাকা বিপুল শক্তির পূর্বাভাস মাত্র। ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য মধুপুর ও ডাউকি ফল্ট লাইন এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নীরব থেকে যে চাপ পুঞ্জীভূত করেছে, তা যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।

এই আশঙ্কার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, প্রকৃতির এই বিপদকে আমরা নিজেদের অব্যবস্থাপনা দিয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছি। রাজউকের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে প্রায় একুশ লাখ স্থাপনা রয়েছে। সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে এর মধ্যে বাহাত্তর হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়বে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিন থেকে চার লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে সংখ্যা পরে আরও বাড়বে। চার তলার বেশি উচ্চতার ভবনগুলোর প্রায় চল্লিশ শতাংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত। বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা বালু ও নরম পলিমাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা তীব্র কম্পনে তরল পদার্থের মতো আচরণ করে বহুতল ভবনকে মাটির নিচে দেবে দিতে বা হেলিয়ে দিতে পারে।

সমস্যা শুধু মাটির দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। বিল্ডিং কোড উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা অবকাঠামো, পুরান ঢাকার তিন থেকে পাঁচ ফুট চওড়া গলিপথ, যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা গ্যাসলাইন, পানি ও স্যুয়ারেজ লাইনের ঝুঁকি, ধারণক্ষমতার বহুগুণ বেশি জনসংখ্যার চাপ সব মিলিয়ে ঢাকা যেন একটি প্রস্তুতিহীন নগরী, যেখানে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা ন্যূনতম। উদ্বেগের বিষয় হলো, ভবনের ফিটনেস যাচাইয়ে কোনো রুটিন কার্যক্রম নেই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত হলেও তার সংস্কার বা অপসারণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী নিজেই স্বীকার করেছেন, ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসে রুটিন কোনো কাজ চলমান নেই।

এই দৃশ্যপট থেকে স্পষ্ট, দুর্যোগ প্রতিরোধের কারিগরি জ্ঞান আমাদের বিশেষজ্ঞদের কাছে যথেষ্ট থাকলেও তা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি দীর্ঘদিনের। বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলছেন, ভূমিকম্প ঠেকানো অসম্ভব হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও প্রকৌশলগত সতর্কতা দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি আশি শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব জাপান ও চিলি যার জীবন্ত প্রমাণ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই পথে হাঁটতে প্রস্তুত, নাকি আরেকটি বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থেকে যাব? নতুন ভবন নির্মাণে বিএনবিসি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং মাটির লিকুইফ্যাকশন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে রেট্রোফিটিং কর্মসূচি শুরু করতে হবে। ব্লু-গ্রিন নেটওয়ার্ক ও নগরের উন্মুক্ত স্থানগুলো সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। কমিউনিটি ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ধার-সক্ষমতা জরুরি ভিত্তিতে বাড়াতে হবে, যেন দুর্যোগের প্রথম গোল্ডেন আওয়ারেই কার্যকর সাড়া দেওয়া যায়। ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট সিটি পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পুরান ঢাকার সংকীর্ণ সড়ক ও গলিপথ প্রশস্তকরণে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।  স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার বাস্তবায়ন এখনই শুরু করতে হবে।

ভূমিকম্প কখন আসবে, তা কেউ বলতে পারে না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে, প্রস্তুতির অভাব একদিন আমাদের এমন এক মূল্য চোকাতে বাধ্য করবে, যা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধারকাজে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার আগেই জীবন বাঁচানোর প্রস্তুতি নেওয়া। ঢাকার নিচে জমে থাকা এসময় বোমা নিষ্ক্রিয় করা না গেলেও, তার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্র পালাতে পারে না।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close