শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: মুক্তাগাছায় শিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলা ও লুটপাট      অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন      হত্যার শিকার হচ্ছেন বিএনপি নেতারা      সর্বনাশা ফাঁদে তারুণরা      বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদারের আশ্বাস ইউএনএফপি’র      চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত      ইরানের বান্দার-ই খামির সেতুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নিহত ৭      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
হারিয়ে যাওয়া মাঠ : শিশুদের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
ফারিহা হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

এক সময় বিকেল মানেই ছিল মাঠে ছুটে যাওয়া। স্কুলের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কানামাছি, দাঁড়িয়াবান্ধা কিংবা লুকোচুরি। এসবই ছিল শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি। সেই বিকেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ধুলোমাখা পা, রোদে পোড়া মুখ, হার-জিতের আনন্দ, দলবদ্ধতার শিক্ষা আর সীমাহীন উচ্ছ্বাস। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের শিশুর বিকেল কাটে চার দেওয়ালের ভেতরে, হাতে থাকে স্মার্টফোন, সামনে ট্যাব বা কম্পিউটারের পর্দা। খেলার সঙ্গী হয়েছে অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যাপস। কারণ, যে মাঠে দৌড়ে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই মাঠই অনেক জায়গায় নেই।

এনে রাখা উচিত খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়; এটি একজন শিশুর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা এবং মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অথচ সেই মৌলিক অধিকার থেকেই ধীরে ধীরে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের লাখো শিশু। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হচ্ছে রাজধানী ঢাকা এখন উন্নয়নের প্রতীক। একের পর এক উঁচু ভবন, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, নতুন আবাসন প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা শহরটিকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর উন্মুক্ত মাঠ। একসময় যেখানে শিশুরা খেলত, সেখানে এখন বহুতল ভবন, পার্কিং এলাকা কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা। শহর বড় হয়েছে, কিন্তু শিশুদের জন্য খোলা জায়গা বা মাঠ ছোট হয়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য ন্যূনতম নয় বর্গমিটার উন্মুক্ত স্থান থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা শারীরিক কর্মকান্ড বা খেলাধুলায় অংশ নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরের অধিকাংশ শিশু সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জনসংখ্যার তুলনায় রাজধানীতে যে পরিমাণ খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন, বাস্তবে তার একটি বড় অংশই অনুপস্থিত। যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোর অনেকই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব কিংবা সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাধারণ শিশুদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না।

শুধু রাজধানী নয়, একই চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরেও। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ, ভূমি দখল এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে উন্মুক্ত খেলার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এমনকি অনেক সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ে যেমন খেলতে পারছে না, তেমনি বাসার আশপাশেও পাচ্ছে না নিরাপদ কোনো উন্মুক্ত পরিবেশ।

এ সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। খেলাধুলা শুধু শরীরকে সতেজ, শক্তিশালী করে না; এটি একজন শিশুকে শেখায় দলগতভাবে কাজ করতে, নিয়ম মেনে চলতে, জয়-পরাজয় মেনে নিতে, নেতৃত্ব দিতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে। মাঠে একজন শিশু যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখে, তেমনি অন্যকে সম্মান করতেও শেখে। বইয়ের পাতা তাকে জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু জীবনকে বুঝতে শেখায় মাঠ।  দেশে আজকের প্রতিটি শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী কিংবা ক্রীড়াবিদ। সেই শিশুর শৈশব যদি কংক্রিটের দেওয়ালের ভেতর বন্দি হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতের সমাজও সংকুচিত হয়ে পড়বে। কারণ, শৈশবের স্বাধীনতা হারালে, মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হারালে সৃজনশীলতাও হারিয়ে যায়।

গত কয়েক বছরে দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ডিজিটাল শিক্ষা বর্তমান সময়ের বাস্তবতা। প্রযুক্তি ব্যব্যহার করায় কোনো অসুবিধা নেই; বরং এটি প্রয়োজনীয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু যখন প্রযুক্তি শিশুদের খেলার মাঠের বিকল্প হয়ে ওঠে কিংবা বিপরীতে শক্ত দেওয়ালের মতো অবস্থান করে, তখন সেটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় অনেক শিশু অবসর সময়ের প্রায় পুরোটাই কাটাচ্ছে মোবাইল গেম, ভিডিও স্ট্রিমিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ভার্চুয়াল জগতে। এর ফলে তাদের শারীরিক সক্রিয়তা কমছে, স্থূলতা বাড়ছে, ঘুমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে, মনোযোগ কমে যাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিশু মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতার বিকল্প কখনোই ভার্চুয়াল জগৎ হতে পারে না। মাঠে খেলার সময় শিশুরা যে সহযোগিতা, সহনশীলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আবেগ প্রকাশ এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শেখাতে পারে না। তাই একটি মাঠ হারানো মানে শুধু একটি খোলা জায়গা হারানো নয়; বরং একটি শিশুর বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে ফেলা।

নগরজীবনের আরেকটি বড় সংকট হলো সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। আগে পাড়া-মহল্লার মাঠে বিভিন্ন বয়সের মানুষ একত্র হতো। সেখানে ছোটরা বড়দের কাছ থেকে শিখত, প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হতো, সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে উঠত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে বন্ধ অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতি। একই ভবনে বসবাস করেও অনেক শিশু একে অপরকে চেনে না। ফলে সামাজিকীকরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। শুধু শিশু নয়, এ সংকটের প্রভাব পড়ছে পুরো সমাজে। গবেষণা বলছে, নিরাপদ বিনোদন ও উন্মুক্ত সামাজিক পরিবেশের অভাব কিশোরদের মধ্যে হতাশা, একাকিত্ব এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা বাড়ছে। যদিও অপরাধের জন্য এককভাবে মাঠের অভাবকে দায়ী করা যায় না, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি শিশু-কিশোরদের ইতিবাচক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাদের সুস্থ সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

মনে রাখা উচিত যে সমাজ শিশুদের জন্য খেলা ধুলার জন্য উন্মুক্ত জায়গা রাখতে পারে না, সে সমাজ ভবিষ্যতের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করতে পারবেনা কারণ। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা। তাই গুরুত্বসহ বিবেচনায় নিতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিতে দক্ষ নাগরিক তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, সহমর্মী এবং সৃজনশীল মানুষ গড়ে তোলা। আর সেই মানুষ তৈরির প্রথম বিদ্যালয় কোনো বহুতল ভবন নয়, কোনো স্মার্ট ডিভাইসও নয়, বরং একটি সবুজ খেলার মাঠই প্রত্যাশিত সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে।
 
লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close