ভারতে সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, সিবিএসই দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ছাত্রসমাজের এ আন্দোলনে শরিক হয়েছেন লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী কর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশনও শুরু করেছিলেন। গত শনিবার সকালে দিল্লি পুলিশ অনশনরত সোনমকে জোর করে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার পর ছাত্রদের যন্তর মন্তর ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ‘সংসদ চলো’ অভিযানে শামিল হতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী গত রোববার রাত ও গতকাল সোমবার ভোরে যন্তর মন্তরে চলে আসেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে দিল্লি পুলিশের দাঙ্গা দমন বাহিনী লাঠিপেটা করে।
গতকাল সকালে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণের অংশগ্রহণে জনসমুদ্রে পরিণত হয় এ পদযাত্রা। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং বিক্ষোভকারীরা যাতে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকতে না পারে, সেজন্য এদিন যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় শত শত পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে ভারত সরকার। বিক্ষোভকারীরা মিছিল নিয়ে পার্লামেন্টের দিকে এগোতে চাইলে এবং একাধিক স্থানে বসানো নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী ও পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হন। এ সময় এক তরুণকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মধ্য দিল্লির বেশ কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এক জরুরি বার্তায় সমর্থকদের শান্ত ও অহিংস থাকার আকুল আবেদন জানানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আপনাদের যদি বিভিন্ন পয়েন্টে আটকে দেওয়া হয়, তবুও শান্ত থাকুন ও শান্তি বজায় রাখুন। আমরা শুধু শান্তি ও ভালোবাসার পথেই জয়ী হতে পারব।’
এরই মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকে তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে জানানো হয়েছে, দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে যন্তর মন্তর থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ।
অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণের হাত ধরে গত মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষাসংক্রান্ত জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র যাত্রা শুরু হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
লং মার্চ সামনে রেখে গত রোববার রাতে পুরো যন্তর মন্তর এলাকা যেন এক অস্থায়ী ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে রাতভর সফর করে আসা শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছে ত্রিপলের নিচে সাধারণ ম্যাট ও পাতলা কম্বল বিছিয়ে রাত কাটান। অনেকেই না ঘুমিয়ে গান গেয়ে, আড্ডা দিয়ে কিংবা সোমবারের মার্চের জন্য প্ল্যাকার্ড এঁকে রাত পার করেন।
বিশাল এই লং মার্চ ঘিরে গত ২৪ ঘণ্টা ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে মিউজিক ফেস্টিভ্যালের প্রস্তুতির সঙ্গে এর মিল ছিল বেশি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবকেরা জরুরি নির্দেশনা ও নিরাপত্তা টিপস শেয়ার করেন।
এদিকে শিক্ষার্থীরা যাতে সমাবেশে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য সংসদ ভবনের কাছাকাছি যতগুলো মেট্রো স্টেশন রয়েছে, সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও বেড়ে চলে বিক্ষোভকারীদের বহর। পুলিশি অনুমানে, একসময় তা ১২ হাজারের মতো দাঁড়ায়। তাদের রুখতে বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। ছাত্ররা বাধা পেয়ে ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
ছাত্রদের জমায়েতে হাজির হয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্র, উত্তর প্রদেশের আজাদ সমাজ পার্টির দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ, আম আদমি পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতারা, জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানা আজমি এবং অভিনেতা প্রকাশ রাজ। শাবানা আজমি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছি। এ অধিকার দেশের সংবিধান দিয়েছে।’ যোগেন্দ্র যাদবসহ নাগরিক সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি যন্তর মন্তরে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের অনশন ভাঙান।
একদিকে ছাত্র আন্দোলন ও ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি, অন্যদিকে অযোধ্যায় রামমন্দিরের কোষাগার লুট, লোকসভা ও বিধানসভার আসন পুনর্বিন্যাস ও নারী সংরক্ষণ, বিরোধী দলগুলোকে অগণতান্ত্রিকভাবে ভাঙানো, মূল্যবৃদ্ধি, বিভিন্ন দমনমূলক আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংসদের অধিবেশন এবারও তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা।
সিজেপির পক্ষ থেকে কেন্দ্রের কাছে মূলত তিনটি দাবি জানানো হয়েছে। সেগুলো হলো—সোনম ওয়াংচুককে দ্রুত হাসপাতাল থেকে মুক্তি দিতে হবে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হবে এবং যে নিট পরীক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করেছে, তাদের এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
জে. পি. নাড্ডার আশ্বাস : সিজেপির প্রতিনিধি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা বিজেপির শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডার সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের মধ্যে আনুমানিক ১০ মিনিটের কথোপকথন হয়েছে। বৈঠক থেকে বেরিয়ে সৌরভ দাস জানান, ‘জে. পি. নাড্ডা আমাদের কথা শুনেছেন এবং আমাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন।’ তবে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি বলে জানিয়েছেন ওই দুই প্রতিনিধি। সৌরভ দাস জানান, জে. পি. নাড্ডা নির্দিষ্ট স্তরে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তবে দাবিপূরণ না হলে আন্দোলন থামবে না বলেও জানিয়েছেন তারা।
কেকে/এলএ