মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: চাঁদপুরে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫      বিএনপির পরিকল্পনা-কর্মসূচি সবসময়ই জনবান্ধব : প্রধানমন্ত্রী      প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী      হাসিনা ও হাদি হত্যাকারীদের ফেরাতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের অনুরোধ      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক      শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়      চমক আসছে মন্ত্রিসভায়      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দেশি পোশাক খাতে আইনি বৈষম্য
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৯:২৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

কাস্টমস ও ভ্যাটসংক্রান্ত বিরোধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশে পরিচালিত বৈদেশিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেলেও কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতায় আটকে যাচ্ছে দেশীয় পোশাকশিল্প। কাস্টমস আইনের হার্ডশিপ (বিশেষ ছাড়) আবেদনের ক্ষেত্রে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের ‘দ্বিমুখী নীতি’র কারণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে। 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একই আইনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অগ্রিম জামানত (স্ট্যাচুটরি ডেপোজিট) ছাড়া আপিল শুনানির সুযোগ দেওয়া হলেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বেলায় সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী, কাস্টমসের কোনো বিচারাদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে আপিল করতে গেলে দাবিকৃত শুল্ক বা জরিমানের ১০ শতাংশ টাকা জামানত হিসেবে জমা দিতে হয়। তবে প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে থাকলে এই অগ্রিম টাকা জমা দেওয়া থেকে অব্যাহতির (হার্ডশিপ) বিধান রয়েছে আইনে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে একই আইনের দুই ধরনের প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। ফলে বিপুল অঙ্কের জরিমানা ও জামানতের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক দেশি তৈরি পোশাক কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। 

কাস্টমস, এক্সাইজ এবং মূল্য সংযোজন কর আপিল ট্রাইব্যুনালের নথি ও আদেশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের এক বিচারাদেশের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ইপিজেডের বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘জিন চ্যাং শুজ (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়ের করে। 

কাস্টমস আইন, ১৯৬৯-এর ১৯৪(১) ধারা অনুযায়ী ১০ শতাংশ অগ্রিম জমা দেওয়া তাদের জন্য ‘অযথা কষ্টকর’ উল্লেখ করে তারা অব্যাহতি বা হার্ডশিপের আবেদন জানায়। গত ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ লুৎফর রহমান এবং সদস্য-বিচার মোহাম্মদ শহীদুল আমিনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ কোনো অগ্রিম জামানত ছাড়াই জিন চ্যাং শুজের আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। অথচ একই ধরনের সংকটে পড়ে আইনি প্রতিকার চাইতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের মুখোমুখি হচ্ছে দেশীয় তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী এলাকার রপ্তানিমুখী এসএমই প্রতিষ্ঠান ‘মেলো ফ্যাশন লিমিটেড’-এর ক্ষেত্রে এই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট নথি ও বিজিএমইএ সূত্র জানায়, শিপিং কোম্পানি ব্যাংক নথি ব্যতিরেকে পণ্য ডেলিভারি দেওয়ায় রপ্তানিমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় মেলো ফ্যাশন। পরে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বার্ষিক অডিট সম্পন্ন হওয়ার পর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একটি রাজস্ব ফাঁকির মামলা দায়ের করে। সবশেষে গত ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বন্ড কমিশনারেট এক বিচারাদেশে মেলো ফ্যাশনকে শুল্ক-কর ও জরিমানা মিলিয়ে মোট ১৯ কোটি ৭৪ লাখ ৪ হাজার ১১ টাকা জরিমানা করে। বিপুল অঙ্কের এই জরিমানের ১০ শতাংশ (প্রায় ২ কোটি টাকা) অগ্রিম জামানত দিয়ে আপিল দায়ের করা মেলো ফ্যাশনের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। 

কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ২২৩ ধারা অনুযায়ী আপিল কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে যে কোনো সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম জামানতের টাকা জমা দেওয়া থেকে শর্তসাপেক্ষে বা বিনাশর্তে অব্যাহতি দিতে পারেন। এ বিধানের আলোকে জামানত ছাড়াই আপিল করার অনুমতি চেয়ে ট্রাইব্যুনাল ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে (আইআরডি) আবেদন জানায় মেলো ফ্যাশন এবং তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও ট্রাইব্যুনাল তাদের সে আবেদন নামঞ্জুর করে।

এর আগে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ট্রাইব্যুনাল প্রেসিডেন্টকে দেওয়া এক চিঠিতে জানান, মেলো ফ্যাশনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের আরেক বিচারাদেশে ‘মেসার্স হাসিব এ্যাপারেলস লি.’-এর ওপরও ৭১ লাখ ৩ হাজার ৭৭৮ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানই রপ্তানিমূল্য না পাওয়ায় তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে। কারখানা সচল রাখতে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ১০% জামানত ছাড়াই আপিল দায়েরের সুযোগ চাওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে দেওয়া বিজিএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রফিক চৌধুরীর সই করা অপর এক চিঠিতেও এই দ্বিমুখী আচরণের প্রতিবাদ জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, ইপিজেডের ‘জিন চ্যাং শুজ’ শতভাগ হার্ডশিপ সুবিধা পেলেও দেশীয় শিল্পকে সেই সুবিধা না দিয়ে বৈষম্য করা হচ্ছে, যা হাইকোর্ট রিটার্ন আদেশের পরিপন্থি।

এদিকে শুধু চট্টগ্রাম নয়, ঢাকার সাভার ডিইপিজেডের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেও একই ধরনের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ‘গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেড’-এর গ্রুপ সিইও চান চি ওয়াই বিজিএমইএকে পাঠানো চিঠিতে কাস্টমসের আইন প্রয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, গোল্ডটেক্স গার্মেন্টসসহ ৫টি প্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের মেয়াদের সামান্য ভুলকে বন্ড কাস্টমস ‘সাধারণ অনিয়ম’ হিসেবে না দেখে রাজস্ব ফাঁকির মামলা দিয়েছে, যদিও তাদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈধ পিআরসি রয়েছে।

চান চি ওয়াই বলেন, ‘একজন সশ্রম কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও জামিন না পেয়ে আপিল করার আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার পান। কিন্তু ব্যবসায়ীদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার শুরুতেই ১০ শতাংশ জামানতের অর্থ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে দেওয়া আমাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।’ 

চিঠিতে বিজিএমইএ সভাপতি স্পষ্ট জানান, প্রতিষ্ঠান দুটি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তাদের দুটি রপ্তানি চালান সংশ্লিষ্ট শিপিং কোম্পানি ব্যাংক ডকুমেন্টস ব্যতিরেকে ডেলিভারি দেওয়ায় তারা রপ্তানিমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এই অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে গেলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং কারখানার পরিচালনা ব্যয় সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো বিপুল অঙ্কের জরিমানা আরোপের অভিযোগ তুলেছেন মেলো ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ পরিচালক সাইফুল্লাহ মনসুর। তিনি বলেন, বন্ড কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে কাস্টমস ও ভ্যাট ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে গেলেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টাকা বাধ্যতামূলকভাবে অগ্রিম জমা (প্রি-ডিপোজিট) দিতে হয়। এই জামানত দিতে ব্যর্থ হলে ট্রাইব্যুনাল শুনানি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে উদ্যোক্তাদের উচ্চ আদালতে আবেদন করতে হয়। আইনি হয়রানি ও জটিলতার ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে বন্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছান। ট্রাইব্যুনাল এখানে স্পষ্টত দ্বিমুখী ও বেআইনি নীতি অনুসরণ করছে। প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে কোনো জামানত ছাড়াই শুনানি গ্রহণ করা হলেও সাধারণ ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা জমার শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যদিও সরকার বাজেটে এই প্রি-ডিপোজিটের হার কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, তবে এই বিধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার দাবি, আপিল আবেদন নিষ্পত্তির আগে কোনো ধরনের জামানত নেওয়াই অনুচিত। কাস্টমসের আদেশের নিরপেক্ষ তদন্ত করাই ট্রাইব্যুনালের কাজ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জরিমানা বহাল থাকবে, আর অন্যায় প্রমাণিত হলে জরিমানা আদেশ বাতিল বা খারিজ হতে হবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘সরকার ব্যবসা সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আর কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত শিল্পায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই দেশের আইন ও ট্রাইব্যুনালে এক যাত্রায় দুই ফল হতে পারে না। চট্টগ্রাম বন্ড কাস্টমসের যে কর্মকর্তা মেলো ফ্যাশনকে বিপুল জরিমানা করেছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার সততা ও সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখা দরকার। স্বেচ্ছাচারিতা থাকলে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।’

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অবশ্য আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কাস্টমস ও ভ্যাট ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে স্ট্যাচুটরি ডেপোজিটের পরিমাণ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে। তবে ইতোমধ্যে কাস্টমসের বিচারাদেশের মুখে পড়া এবং ট্রাইব্যুনালে ঝুলন্ত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে এই দ্বিমুখী আচরণের কী সমাধান হবে, সে বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।

শিল্প খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি বৈষম্য ও ট্রাইব্যুনালের কঠোর মনোভাবের কারণে দেশীয় অনেক ছোট ও মাঝারি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। দ্রুত এই নীতিগত জটিলতা নিরসন না হলে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

কেকে/এলএ





আরও সংবাদ   বিষয়:  পোশাক খাত   আইনি বৈষম্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close