রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সদ্য বদলি হওয়া প্রধান কারারক্ষী ছামিউল ইসলামকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগের তদন্ত করছে কারা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি কারাগারের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বাইরে নিজস্ব প্রভাববলয় সৃষ্টি করেছিলেন। সেই বলয়ের মাধ্যমে কারাগারে অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারী সূত্রগুলোর ভাষ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় কারাগারে অস্থিরতা ও বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য পাচার, প্রভাবশালী বন্দিদের অর্থের বিনিময়ে মোবাইল ফোন ও বিশেষ সুবিধা প্রদান, মাদকাসক্ত বন্দিদের কাছে মাদক সরবরাহ, জামিন বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মব তৈরির মতো অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ছামিউল ইসলাম কারারক্ষীদের একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই বলয়ের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার এবং দায়িত্বে অবহেলার পাশাপাশি কারাগারের অভ্যন্তরে বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী তার প্রভাবের কারণে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলতে সাহস পেতেন না। তদন্তে উঠে এসেছে, কারাগারের কিছু স্বচ্ছল বন্দির সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার, হাসপাতাল সুবিধা, অতিরিক্ত সাক্ষাৎ এবং অন্যান্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হতো। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত কয়েকজন বন্দির কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া কয়েকজন মুহুরির মাধ্যমে একটি জামিন-সংশ্লিষ্ট আর্থিক চক্র পরিচালনার অভিযোগও তদন্তে রয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, কার জামিন হবে সেই তথ্য আগেই সংগ্রহ করে বন্দি বা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো। পরে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। তদন্তকারীরা এসব অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করছেন।
রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কারাগারে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে ছামিউলের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাদের বার্তা ও সাংগঠনিক নির্দেশনা কারাগারের বাইরে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
কারা প্রশাসনের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এটি তার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ নয়। চাকরি জীবনে কর্তব্যে অবহেলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অসদাচরণের অভিযোগে তাকে একাধিকবার প্রশাসনিক বদলি, তিনবার সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা এবং পাঁচবার সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও তিনি প্রধান কারারক্ষীর দায়িত্ব পালন করেন। গত ১৮ জুন রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার এএসএম কামরুল হুদা বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো এক লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেন, প্রধান কারারক্ষী ছামিউল ইসলাম প্রশাসনের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং তার কার্যকলাপের কারণে কারাগারের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যাহত হচ্ছে। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে প্রশাসনিক কারণে পঞ্চগড় কারাগারে বদলি করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়।
রংপুর বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক কামাল হোসেন বলেন, “ছামিউল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশাসনিক স্বার্থে তাকে বদলি করা হয়েছে। তার দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে এবং বিভাগীয় কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
সিনিয়র জেল সুপার এএসএম কামরুল হুদা বলেন, “কারা প্রশাসনের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই তাকে অন্যত্র বদলির সুপারিশ করা হয়েছিল।”
ছামিউল ইসলামের ফোন জব্দ থাকা ও তাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখায় তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে “মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই শেষে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার অনিয়মের ঘটনা নয়, বরং কারাগারের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নেও বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে।
কেকে/এলএ