বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: এলডিসি উত্তরণে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সুপারিশ ইকোসকের      রাজধানীর হাজারীবাগে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত      মুক্তি পেলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা      রংপুর কারাগারে ছামিউল সাম্রাজ্য      দেশি পোশাক খাতে আইনি বৈষম্য      দেশে ফিরেছেন বাংলার জয়যাত্রার নাবিকেরা      দিল্লিতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
হাওরের শিক্ষাব্যবস্থা: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৫ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীতে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং সেই পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা অমূলক নয়। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্য, যার জন্য তিনি পরে সংসদে ক্ষমা চেয়েছেন। গণতান্ত্রিক সমাজে নিজের বক্তব্যের দায় স্বীকার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক রাজনৈতিক আচরণ। কিন্তু এ ঘটনাই আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে—রাষ্ট্র কি শুধু দৃশ্যমান সংকটের প্রতিই দ্রুত সাড়া দেয়, নাকি দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা নীরব বঞ্চনাগুলো তার নীতিনির্ধারণের প্রান্তেই পড়ে থাকে?

এ প্রশ্নের সবচেয়ে নির্মম উত্তর পাওয়া যায় বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই রাজধানীর সাময়িক জলাবদ্ধতা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে, নীতিনির্ধারকদের তৎপরতাও চোখে পড়ে। অথচ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরে বছরের ছয় থেকে আট মাস জলাবদ্ধতা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; সেটিই মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। সেখানে বিদ্যালয়ে যাওয়া মানে শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়া নয়, প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে একটি সাংবিধানিক অধিকার অর্জনের চেষ্টা।

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে শিক্ষা আজও ভৌগোলিক বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার। উত্তাল জলরাশি, অনিরাপদ নৌযাত্রা, ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা এবং দীর্ঘ বর্ষা—এসবের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেই শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। অথচ জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় এ বাস্তবতার প্রতিফলন খুব সামান্য। সমতলভূমির জন্য প্রণীত একই শিক্ষা ক্যালেন্ডার, একই প্রশাসনিক কাঠামো এবং একই অবকাঠামোগত পরিকল্পনা হাওরের ওপরও সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যেন ভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতার জন্য ভিন্ন নীতির প্রয়োজনই নেই। ফলাফল অনিবার্যভাবেই বৈষম্যমূলক।

সুনামগঞ্জের শিক্ষা-পরিসংখ্যান সেই বৈষম্যের কঠিন ভাষ্য বহন করে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের গড় সাক্ষরতার হার যেখানে ৭০ শতাংশের বেশি, সেখানে শাল্লা উপজেলায় শিক্ষার হার মাত্র ২০ দশমিক ১০ শতাংশ; ধর্মপাশায় প্রায় ৪০ দশমিক ৩০ শতাংশ। নারীদের শিক্ষার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সামগ্রিক শিক্ষার হার প্রায় ৩১ শতাংশ হলেও নারীদের শিক্ষার হার ২৪ শতাংশেরও নিচে।

ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার ৯৭.৫৬ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত টিকে থাকার হার ৮৬.৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ ঝরে পড়ার হার ১০.৬৩ শতাংশ। যদিও তা উল্লেখযোগ্য উন্নতি, তবুও অন্যান্য জেলার তুলনায় এটি ন্যূনতম। এসব পরিসংখ্যান শুধু শিক্ষার দুরবস্থা নির্দেশ করে না; এগুলো রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, সম্পদ বণ্টন এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের বৈষম্যও স্পষ্ট করে।

হাওরের শিক্ষাসংকটের কারণ নতুন নয়। বিদ্যালয়ের স্বল্পতা, দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, দারিদ্র্য, অনুপযোগী শিক্ষা ক্যালেন্ডার, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে এখানকার শিশুরা শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই অসম প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হয়। তাদের সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা মেধার ঘাটতি নয়; জন্মস্থান। এ কারণেই হাওরের শিক্ষাবঞ্চনাকে শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক সমতা এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। কোনো দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাজধানীর শিশুর মতোই প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুও সমান নিরাপত্তা, সমান সুযোগ এবং সমান মর্যাদা নিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারে। সেই মানদণ্ডে হাওরের বাস্তবতা আজও বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়।

মধ্যনগর উপজেলার বাস্তবতা এই বৈষম্যের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। দুর্গম হাওরবেষ্টিত এ উপজেলার পাঁচ থেকে ১১ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশু আজও প্রাথমিক শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। উপজেলার মোট ১৪৭টি গ্রামের মধ্যে ৬৩টি গ্রামেই নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফলে এসব গ্রামের তিন সহস্রাধিক কোমলমতি শিশুর কাছে প্রাথমিক শিক্ষার আলো কখনোই পৌঁছায় না।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যনগরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৪টি। এসব বিদ্যালয়ে ১১ হাজার ৬১৯ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ হাজার ৭৫০ জন ছাত্র ও ৫ হাজার ৯১৯ জন ছাত্রী। এর মধ্যে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১১.০৫ শতাংশ। অর্থাৎ সহস্রাধিক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও নানা কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। তবে স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের এ তথ্যের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার যৌথ জরিপ বলছে, এ উপজেলায় প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং পাঁচ থেকে ১১ বছর বয়সী ভর্তিবিহীন শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এসব শিশুর শৈশব বই, খাতা ও শ্রেণিকক্ষের বদলে কেটে যায় হাওরে মাছ ধরা, কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরির কাজে। রাষ্ট্রের কাছে এটি শুধু একটি সাধারণ পরিসংখ্যান হলেও এটি হারিয়ে যাওয়া হাজারো শৈশবের হিসাব। যৌথ প্রতিবেদন মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় এসব গ্রামের হাজার হাজার শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই শিক্ষাবঞ্চনার ঝুঁকিতে পড়ে। ছয় থেকে সাত মাস জলমগ্ন দ্বীপের মতো ভেসে থাকা হাওরের অধিকাংশ গ্রামই পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং বেশ দূরত্বে অবস্থিত। এতে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের বিদ্যালয়ে যাওয়া কোমলমতি শিশুদের পক্ষে খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রতিকূল অবস্থার কারণে অভিভাবকেরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ ছাড়া যেসব গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, সে গ্রামে শুকনো মৌসুমে শিশুরা কোনোভাবে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলেও বর্ষার ছয় থেকে আট মাস বেশির ভাগই অনিয়মিত কিংবা একেবারেই বিদ্যালয়ে যায় না। কার্যত হাওরে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার একটি বড় অংশ মৌসুমি শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। ফলে তারা শিক্ষা অর্জনের মাপকাঠিতে প্রায়শই নিচের দিকে অবস্থান করে।

বিদ্যালয় থাকলেও সংকট শেষ হয় না। উপজেলার ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৩০টি এবং সহকারী শিক্ষকের ২৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন সাত থেকে আট কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এসব শিক্ষার্থী শুকনো মৌসুমে পায়ে হেঁটে আর বর্ষাকালে নৌকায় দুর্গম হাওর পাড়ি দিয়েই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়। তাদের কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ যাতায়াত নয়; প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকির সঙ্গে এক নীরব সমঝোতা।

এ ঝুঁকির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতি ২০১০ সালের ৮ জুন মধ্যনগরের পাশের উপজেলা ধর্মপাশার শৈলচাপড়া হাওরের ট্রলারডুবি। বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে মুহূর্তের মধ্যে পানির নিচে তলিয়ে যায় একটি ট্রলার। আটজন স্কুলশিক্ষার্থীসহ ১৬টি প্রাণ নিভে যায়। সেই দিন হাওরের জলে শুধু একটি নৌকা ডুবেনি; ডুবে গিয়েছিল বহু পরিবারের স্বপ্ন, বহু মায়ের ভবিষ্যৎ, বহু শিশুর অসমাপ্ত জীবন। ছোট ছোট স্কুলব্যাগ, ভেজা বই-খাতা আর স্বজনহারাদের আহাজারি আজও হাওরের মানুষের স্মৃতিতে অমোচনীয়।

সেই ঘটনায় দেশ শোকাহত হয়েছিল, প্রতিশ্রুতিও এসেছিল। নিরাপদ নৌযান, শিক্ষার্থী পরিবহনের মানদণ্ড, বর্ষাকালীন বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা—অনেক ঘোষণাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেড় দশক পরও বাস্তবতা মোটেও বদলায়নি। আজও অসংখ্য শিক্ষার্থী ছোট নৌকায় বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে, আর প্রতিবছরই কমবেশি স্কুলগামী শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ শৈলচাপড়ার সেই ট্র্যাজেডি রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিতে পারেনি। যখন একটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয় না, তখন পরবর্তী দুর্ঘটনা আর শুধু দুর্ঘটনা থাকে না; তা নীতিগত ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

হাওরাঞ্চলে শিক্ষা বঞ্চনার আরেকটি প্রতীক মধ্যনগরের বংশীকুণ্ডা কলেজ। এক যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত উপজেলার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের একমাত্র স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রণীত এমপিও নীতিমালার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করার পরও আজ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত হয়নি। নেই স্থায়ী একাডেমিক ভবন; টিনের জরাজীর্ণ কক্ষে চলছে পাঠদান। শিক্ষকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন, শিক্ষার্থীরা সীমিত সুযোগ নিয়েই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ এ কলেজটি এমপিওভুক্ত হলেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হতো এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উন্নীত করা যেত। এতে দুর্গম এ হাওরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হতো।

তখন প্রতিবছর ৫০ থেকে ৭০ ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঝরে পড়ত না। প্রশ্ন হলো, কেন? সরকারের নির্ধারিত শর্ত পূরণের পরও বংশীকুণ্ডা কলেজ এমপিওভুক্ত হচ্ছে না কেন? প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত অগ্রাধিকারের অভাব, নাকি হাওরাঞ্চল বলেই এই প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে? একটি যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সেটি শুধু একটি কলেজের সমস্যা নয়; সেটি রাষ্ট্রীয় সমতার নীতিরও প্রশ্ন।

বর্তমান শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি কলেজ জাতীয়করণের অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন যদি হাওরের মানুষের জীবনে না পৌঁছায়, তবে উন্নয়নের ভাষ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ একটি অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়; সেটি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। আর সেই ভিত্তিই যখন বছরের পর বছর অবহেলার ভারে নুয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার নৈতিক বিশ্বাস।

সমস্যার কারণ যে অজানা, তা নয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার দুর্গম এলাকায় বহুতল একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস, শিক্ষক ডরমিটরি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল এ উদ্যোগের। কিন্তু প্রকল্পের প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর এর অগ্রগতি কার্যত থমকে যায়। বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। মেয়াদ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি। উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য বরাদ্দের অঙ্কে নয়; সময়মতো বাস্তবায়ন এবং মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাবেই পরিমাপ করা উচিত।

হাওরের শিক্ষাসংকট মূলত নীতিগত সংকট। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো সমতলভূমির বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। কিন্তু বছরের দীর্ঘ সময় যখন হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন থাকে, তখন একই শিক্ষা ক্যালেন্ডার, একই প্রশাসনিক কাঠামো এবং একই পাঠদান পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে না। ভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতার জন্য ভিন্ন নীতি গ্রহণই সুশাসনের স্বাভাবিক দাবি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে কার্যকর, সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-৪) অঙ্গীকারও একই কথা বলে—প্রত্যেক শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু হাওরের শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা দেখায়, জন্মস্থান আজও শিক্ষার সুযোগ নির্ধারণে একটি নিষ্ঠুর নিয়ামক হয়ে আছে। এটি শুধু উন্নয়ন-ঘাটতির নয়; সাংবিধানিক অঙ্গীকার অপূর্ণ থাকারও প্রশ্ন।

এ বাস্তবতা পরিবর্তনে খণ্ডিত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। হাওরাঞ্চলের জন্য পৃথক শিক্ষা পরিকল্পনা, ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ক্যালেন্ডার, বিদ্যালয়হীন গ্রামে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিরাপদ শিক্ষার্থী নৌপরিবহন, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের বিশেষ প্রণোদনা, জলবায়ু-সহনশীল বিদ্যালয় ভবন, প্রয়োজনভিত্তিক আবাসিক ও ভাসমান বিদ্যালয় এবং নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় নীতির অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলোর স্বাধীন মূল্যায়ন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কোনো প্রকল্পের ব্যয় নয়; বরং সেই প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কতজন শিশু নিরাপদে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারছে, কতজন ঝরে পড়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে এবং কতজনের ভবিষ্যৎ বদলাচ্ছে—সেই ফলাফল। হাওরের শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়নও সেই মানদণ্ডেই হওয়া উচিত।

এখানেই শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহির প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাজধানীর কয়েক দিনের জলাবদ্ধতা যদি জাতীয় নীতিনির্ধারণের আলোচ্য হতে পারে, তবে হাওরের যুগযুগ ধরে চলতে থাকা শিক্ষাবঞ্চনা কেন জাতীয় অগ্রাধিকার হবে না? কেন এখনো বিদ্যালয়হীন গ্রামগুলো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পায়নি? কেন নিরাপদ শিক্ষার্থী নৌপরিবহনের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি? কেন বংশীকুণ্ডা কলেজের মতো শর্তপূরণকারী প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকবে? আর কেন হাওরের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পৃথক শিক্ষা পরিকল্পনা আজও কাগজের বাইরে আসতে পারেনি?

এসব প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করার জন্য নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নীতিগত জবাবদিহির প্রশ্ন। তবে সেই জবাবদিহি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষামন্ত্রী নিজেদের আলাদা রাখতে পারেন না। কারণ শিক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক খাত নয়; এটি সংবিধানপ্রদত্ত সমঅধিকার বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম। যে রাষ্ট্রে একটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ তার জন্মস্থানের ওপর নির্ভর করে, সেখানে বৈষম্য শুধু সামাজিক নয়—সাংবিধানিকও।

শিক্ষামন্ত্রী একটি মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। সেটি রাজনৈতিক সৌজন্যের পরিচয়। কিন্তু হাওরের শিশুরা কোনো মন্তব্যে আহত হয়নি; তারা আহত হয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা নীতিগত অবহেলা, অসম উন্নয়ন এবং বাস্তবায়নহীন প্রতিশ্রুতিতে। সেই ক্ষত ক্ষমা চেয়ে মুছে ফেলা যায় না; মুছে ফেলতে হয় কার্যকর সিদ্ধান্ত, ন্যায্য বাজেট, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো মন্ত্রীর বক্তব্যকে নয়, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে মনে রাখে; কোনো প্রতিশ্রুতিকে নয়, বাস্তবায়নকে মূল্যায়ন করে। যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুটির হাতেও সমানভাবে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে পারে, শুধু সেই রাষ্ট্রই নিজেকে সত্যিকার অর্থে ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র বলে দাবি করার নৈতিক অধিকার অর্জন করে।

লেখক: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও হাওর উন্নয়নবিষয়ক চিন্তক

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রতিশ্রুতি   বাস্তবতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close