বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রী      রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে যা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      পদত্যাগের আভাস রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের      ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যা মামলার আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর      ভর্তুকির সার পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে      জ্বালানি তেল নিয়ে ফের গুজবের পাঁয়তারা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নীতি থেকে অবকাঠামোয় যাওয়ার সময় এখনই
বেনজির আহম্মেদ শাওন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৮:০৫ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনার একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা এখনো বিষয়টিকে প্রধানত ঝুঁকি, নৈতিকতা আর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হিসেবে দেখি; অথচ বিশ্ব এআইকে এখন উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, ভাষাগত সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর এআই প্রস্তুতিতে চারটি ভিত্তির কথা বলছে-সংযোগ, কম্পিউট, প্রাসঙ্গিক ডেটা এবং দক্ষতা। আমাদের আলোচনাও এখন এই চার ভিত্তিতে নামিয়ে আনতে হবে। নইলে আমরা প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থাকব, নির্মাতা হব না।

এ বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের এআই অ্যাকশন প্ল্যানে ৯০টির বেশি নীতিগত পদক্ষেপের পাশাপাশি ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর স্থাপনা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়নের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ভারতও কথায় থেমে নেই। তাদের ইন্ডিয়াএআই মিশনের জন্য তারা ১০,৩৭২ কোটি রুপির বাজেট দিয়েছে, ১০,০০০ জিপিইউ অর্থাৎ গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, পরে ১৮,৬৯৩ জিপিইউ-সমৃদ্ধ কমন কম্পিউট সক্ষমতার কথা জানিয়েছে, এবং স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষিতভিত্তিক মডেল তৈরিতে এগিয়েছে। অর্থাৎ, বড় রাষ্ট্রগুলো বুঝে গেছে : এআইতে নেতৃত্ব মানে শুধু নীতিমালা নয়, কম্পিউট, বিদ্যুৎ, ডেটা আর দক্ষ মানুষে বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক খসড়া এআই নীতিমালা করা হয়েছে। এবং এই নীতিমালাকেও একেবারে হালকাভাবে দেখলে ভুল হবে। সর্বশেষ দ্বিতীয় সংস্করণ খসড়াতে ঝুঁকিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস আছে, উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন সিদ্ধান্তের জন্য ব্যাখ্যাযোগ্যতার কথা আছে, এছাড়া আছে গণবিচ্ছিন্ন বায়োমেট্রিক নজরদারির বিরুদ্ধে সুরক্ষার কথা। এমনকি এআই ইনোভেশন ফান্ড, প্রকল্প বাস্তবায়ন সেল এবং একটি জাতীয় বাংলা ভাষা মডেলের প্রস্তাবও আছে। এসবই ইতিবাচক। এত দিন যে বাংলাদেশে এআই নিয়ে আলোচনা মূলত বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত ছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এটি একটি দরকারি সূচনা।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় : সূচনা কি যথেষ্ট? একটি নীতিমালা দিকনির্দেশ দেয়, কিন্তু একটি কর্মপরিকল্পনা বলে কে কী করবে, কখন করবে, কত অর্থে করবে এবং ব্যর্থ হলে জবাবদিহি কার হবে। খসড়ায় ইনোভেশন ফান্ডের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, কিন্তু এর প্রকাশ্য আকার, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি, কিংবা কোন খাতে কতটা বরাদ্দ যাবে, তা স্পষ্ট নয়। খসড়ায় জাতীয় বাংলা ভাষা মডেলের কথাও আছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই মডেল কোন কম্পিউট অবকাঠামোয় চলবে, কীভাবে ডেটা সংগ্রহ হবে, কীভাবে গুণগত মূল্যায়ন হবে, দেশীয় গবেষক ও উদ্যোক্তারা কীভাবে এতে অংশ নেবেন, এসব প্রশ্নের আলাদা রূপরেখা এখনো দেখা যায়নি। নীতিমালার সেখানেই সীমা, আর কর্মপরিকল্পনার সেখানেই শুরু।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নিজস্ব কম্পিউট সক্ষমতা তৈরি করা। সংবেদনশীল স্বাস্থ্য, বায়োমেট্রিক, আর্থিক বা রাষ্ট্রীয় ডেটার ক্ষেত্রে বিদেশি অবকাঠামোর ওপর অতিনির্ভরতা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করে। খসড়া নীতিমালাই বলছে, এমন ডেটা বাংলাদেশে বা সরকার নির্ধারিত নিরাপদ বিচারব্যবস্থায় সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে। এই নীতিগত অবস্থানকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রসমর্থিত হাই পারফরম্যান্স কম্পিউটিং ক্লাস্টার, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা অ্যাক্সেস, দেশীয় স্টার্টআপের জন্য ভর্তুকিযুক্ত জিপিইউ ব্যবহার সুবিধা এবং একটি সময়বদ্ধ জাতীয় ডেটা অবকাঠামো রোডম্যাপ দরকার। ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর পেছনে সার্ভার, বিদ্যুৎ, ব্যান্ডউইথ এবং দক্ষ অপারেশন টিম থাকবে।

স্বাস্থ্য খাতে এআই নিয়ে আমাদের অবস্থানও হওয়া উচিত বাস্তববাদী। এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়, কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি ও বণ্টন বৈষম্যের দেশে এটি শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নথি বলছে, বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি দীর্ঘদিনের; একইসঙ্গে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশলে টেলিমেডিসিন, আন্তঃপরিচালনযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য এবং এআই সমর্থিত বিশ্লেষণের কথাও রয়েছে। ফলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ট্রিয়াজ অর্থাৎ রোগী বাছাই প্রক্রিয়া, রোগ নজরদারি, সরঞ্জাম ও ওষুধের চাহিদা পূর্বাভাস, দূরবর্তী পরামর্শ এবং রেফারাল ব্যবস্থায় এআই ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এর শর্ত একটাই : নিরাপদ স্বাস্থ্য-ডেটা রেজিস্ট্রি, রোগীর সম্মতি, চিকিৎসক-তদারকি, এবং ছোট ছোট পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে শেখার ক্ষমতা। স্বাস্থ্যখাতে এআইয়ের প্রশ্নে আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির মোহ নয়, দায়িত্বশীল ব্যবহার। 

সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রশ্নটি শ্রমবাজারে। তৈরি পোশাক খাত আজও ৪০ লক্ষের বেশি মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, এবং শ্রমিকদের বড় অংশ নারী। এই খাতে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণ উৎপাদনশীলতা বাড়াবে-এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে চাকরির ধরন পাল্টাবে, কিছু কাজ উঠে যাবে, কিছু কাজের দক্ষতার মান বদলে যাবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত বিভিন্ন গবেষণায় বহুদিন ধরেই সতর্ক করা হয়েছে যে স্বয়ংক্রিয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈশ্বিক শ্রমবাজারকে অসমভাবে প্রভাবিত করবে, যেখানে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো দ্রুততর কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান, যেখানে তৈরি পোশাক খাতে স্বয়ংক্রিয়তার ফলে শ্রমশক্তি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তাই এআই নীতিমালার পাশাপাশি আমাদের দরকার রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ন্যায্য রূপান্তর কাঠামো : পুনঃপ্রশিক্ষণ তহবিল, কারখানাভিত্তিক পুনঃদক্ষতা বাধ্যবাধকতা, নারী শ্রমিকের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, এবং যেসব প্রতিষ্ঠান ছাঁটাই এড়িয়ে দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে তাদের জন্য করপ্রণোদনা। প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে যদি সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে না জোড়া যায়, তবে উৎপাদনশীলতার সাফল্যও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন আসল প্রশ্নটি নীতি বনাম উদ্ভাবনের নয়; বরং নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্মাণের। খসড়া নীতিমালার নৈতিক ভিত্তি দরকারি, কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয়। আমাদের এমন একটি জাতীয় এআই কর্মপরিকল্পনা চাই, যেখানে কম্পিউট অবকাঠামো, গবেষণা অর্থায়ন, বাংলা ও স্থানীয় ভাষার ডেটা, স্বাস্থ্যখাতের ব্যবহার, শিল্পখাতে পুনঃদক্ষতা এবং সংবেদনশীল ডেটা সুরক্ষার বিষয়গুলো সময়বদ্ধভাবে লেখা থাকবে। ভবিষ্যৎ সেই দেশেরই, যারা প্রযুক্তিকে দূর থেকে দেখে না; যারা নিজেদের ভাষা, নিজেদের শ্রমশক্তি, নিজেদের ডেটা এবং নিজেদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে সেই ভবিষ্যৎ গড়ে। বাংলাদেশেরও এখন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  নীতি   অবকাঠামোয় যাওয়া   বেনজির আহম্মেদ শাওন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close