২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ফেনীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন চরম অবনতির দিকে, তখন জেলার প্রশাসনিক দায়িত্বে আসে বড় পরিবর্তন। একের পর এক জেলা প্রশাসক বদলির পর গত ২৭ অক্টোবর ফেনীর জেলা প্রশাসক হিসেবে মনিরা হককে নিয়োগ দেয় সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফেরানো ও জনসেবার মানোন্নয়নে নেওয়া নানা উদ্যোগে তিনি আলোচনায় আসেন।
এর পূর্বে, তিনি ২০১৬-১৭ সালে ফেনীর পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ফেনীর তিনটি আসনে কোন ধরনের সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা ছাড়া দক্ষতার সাথে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন মনিরা হক। জাতীয় নির্বাচনে মনিরা হকের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়াটাই যেন কাল হলো তার!
নির্বাচনের পূর্ব থেকেই একটি অদৃশ্য কুচক্রী মহল তাকে রাজনৈতিক বিভিন্ন ট্যাগ লাগিয়ে তার সুনাম নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) তিনি নিজ বাসা থেকে যাতায়াত করে অধ্যয়ন করার কারণে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে তার সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ছিলো না এবং কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত থাকারও তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু সুবিধাভোগী মহল ঠিকাদারির কাজ এবং মনিরা হক থেকে কোন সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে রাজনীতিক ট্যাগ লাগিয়ে অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজে মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছে।
মনিরা হকের বিরুদ্ধে নির্বাচনের পূর্বে থেকেই এই চক্রটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন বানোয়াট কল্প কাহিনি সাজিয়ে বিভ্রান্তমূলক সংবাদ প্রচার করে। এমন সংবাদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন না করেই একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বর্তমান সরকারের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করে উন্নয়নমূলক কাজে বাধা দিচ্ছে এই চক্রটি। নির্বাচনের পর থেকে এমন ভিত্তিহীন অপপ্রচারের কারণে সরকারি কর্মকর্তারা কাজে অনিহা এবং মানসিকভাবে থমকে যাচ্ছেন।
অনেকে মনে করছেন, কারও গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার করা হচ্ছে। এটি গোয়েন্দা সংস্থা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সরেজমিনে ফেনীর জেলা প্রশাসকের চলমান কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাত-দিন পরিশ্রম করে মনিরা হক জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য, শিশু কল্যাণ, পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে একের পর এক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসকের আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি পদক্ষেপ হলো-ফেনী জেলার ১৮২টি মৌজার সরকারি খাস জমি চিহ্নিত করেছেন। সাইনবোর্ডের মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েই ইতোমধ্যে তিনি ফেনীর ৬৫টি মৌজার খাস জমি চিহ্নিত করেছেন। যা ইতিপূর্বে ফেনীর আর কোন জেলা প্রশাসক সফলভাবে করতে পারেননি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে সরকারি জমি দখল প্রতিরোধ, ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হবে আর রাজস্বও পাবে সরকার। তার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল ও অবৈধ স্থাপনার কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া ফেনীর দাউদপুর খাল পুনরুদ্ধারে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে খাল দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। এতে করে ফেনী পৌরসভার নাগরিকদের জলবদ্ধতায় আর ভোগান্তি হবে না। ফেনী জেলার শিক্ষা খাতেও নেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ফেনীর শিশু নিকেতন কালেক্টরেট স্কুলের নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ৩ আগস্ট জেলা ব্যাপী জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজের সমন্বয়ে ‘ক্লিন ফেনী’ কর্মসূচি পালন করাা হবে। পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য ফেনী জেলা গঠনে এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেনীর ঐতিহাসিক বিজয় সিংহ দিঘীকে ফেনীর আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন তিনি। এই প্রকল্পের আওতায় ওয়াকওয়ে, ফুড কোর্ট, ওয়াটার ফাউন্টেইন, বাউন্ডারি ওয়ালসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, পুনর্বাসনের ১০০ জন পথশিশুকে তালিকাভুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ফেনীর জেলা প্রশাসক। যা ইতোমধ্যে ৩৩ জন শিশুকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদেরকে পুনর্বাসনের কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে বইমুখী ও মেধাবী হিসেবে গড়ে তুলতে ফেনীর ৬টি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে বই পড়ার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেন মনিরা হক।
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীর জেলা প্রশাসকের আরেকটি উদ্যোগ সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে, সন্ধ্যার পর বাজারঘাটে, শপিংমল এলাকা ও জনসমাগমস্থলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় আড্ডা ও ঘোরাফেরা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে ফেনী জেলা জুড়ে জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে মাইকিং করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মনিরা হক।
অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখতে ও অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের ভাষ্যে, ফেনীর জেলা প্রশাসকের এ উদ্যোগ সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
এদিকে ফেনীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মধ্যেই জেলা প্রশাসককে নিয়ে ফেসবুক পেজ ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশ করা কল্পকাহিনি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা থেমে নেই।
সচেতন নাগরিকদের মতে, গণমাধ্যম বা ফেসবুক পেজে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য-যাচাই, উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ ও সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা—দুটি বিষয়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
উন্নয়নের ইতিবাচক দিক যেমন জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন, তেমনি যেকোনো অভিযোগও প্রমাণ ও যাচাইয়ের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
ফেনীবাসীর প্রত্যাশা, ফেনীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের চলমান ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হকের বিকল্প আর কেউ নেই। তার নেওয়া উন্নয়নমূলক পদক্ষেপেই এগিয়ে যাবে ফেনী জেলা।
ফেনীর রাজনৈতিক মহল জানান, সরকারের উন্নয়নমুলক কাজে বাধা প্রদানকারী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও চক্রান্তকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে চক্রান্তকারীরা আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উন্নয়নে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা ব্যর্থ হয়ে যাবে। মনোবল হারাবে সরকারি কর্মকর্তারা।
কেকে/এমএ