দেশজুড়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। এর সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গ্যাস-সংকটে রান্নার জন্য বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে। লোডশেডিং তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। রোববার দেশে প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। কমে গেছে বহু শিল্পকারখানার উৎপাদন। ফলে বিভিন্ন খাতে নীরব শঙ্কা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
এদিকে গ্যাস-সংকটের কারণে আগামী বুধবার (৩০ জুলাই) সিএনজি স্টেশন বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে স্টেশন মালিক সমিতি। গ্যাস-সংকটের কারণে সড়কে কমে গেছে সিএনজিচালিত যানবাহন। আবার ভাড়াও বেড়ে গেছে।
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। শুক্রবার বিকেল থেকে ওই টার্মিনালে মেরামতের কাজ শুরু হয়। তবে কবে নাগাদ তা শেষ হবে, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎস ও আমদানি থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এই ঘাটতির মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গ্যাস-সংকট তীব্র হয়েছে। এতে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি বাড়ছে। অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে বা ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি বন্ধ হয়েছে। গ্যাস-সংকটে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহক এবং সিএনজিচালিত যানবাহনের মালিক-চালকেরা।
অটোরিকশাচালক রায়হান কবীর বলেন, গ্যাস নিতে গিয়ে আর যাত্রী বহনের সময় মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে অনেক অটোরিকশা গ্যারেজে বসে আছে।
কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হাসান নিপু বলেন, অধিকাংশ বাসায় কয়েক দিন ধরে লাইনের গ্যাসের চুলায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ায় সেই চুলাও হিসাব করে চালাতে হচ্ছে। গ্যাসের সমস্যা এখন পরিবারের অন্যতম ভোগান্তির কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সমস্যা সমাধান না হলে বিদ্যুৎ-সংকটও দূর হবে না। বিকল্প উপায়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারলে পরিস্থিতিরও কোনো পরিবর্তন হবে না।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিচালক (কারিগরি) পরিতোষ সূত্রধর জানান, গ্যাস-সংকট দেখা দেওয়ার পর লোডশেডিংও কিছুটা বেড়েছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তা জ্যোতিষ চন্দ্র রায় জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় সামান্য লোডশেডিং রয়েছে।
আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাস-সংকট কমবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাসের সংকট কমবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, গ্যাস-সংকটের জন্য জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু এটি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি। তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে সরকার। তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা। এ জন্য বারবার দুঃখ প্রকাশ করছে সরকার। আশা করছি, আগামী সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। গতকাল সোমবার (২৮ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস-সংকট গত সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্রতা বেড়েছে। এই মুহূর্তে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট, যেখানে আমরা সরবরাহ করতে পারছি ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট। এর মধ্যে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট দেশীয় উৎপাদন, আর বাকিটা আমদানিকৃত। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ঠিক আছে, কিন্তু একটি এফএসআরইউতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ ত্রুটিগ্রস্ত হয়েছে। তারা প্রথমে আশা করেছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি ঠিক করতে পারবে। পরবর্তীতে ত্রুটি মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ এনেছে তারা।
সিএনজি স্টেশন মালিকদের কর্মসূচি প্রত্যাহার
গ্যাস-সংকটের কারণে আগামী বুধবার (৩০ জুলাই) সিএনজি স্টেশন বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে স্টেশন মালিক সমিতি। ৩০ জুলাইয়ের কর্মসূচি প্রত্যাহার করলেও দাবি মানার জন্য আগামী শুক্রবার (২২ আগস্ট) পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।
সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশজুড়ে গ্যাস-সংকটের কারণে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। দাবি না মানলে আগামী শনিবার (২৩ আগস্ট) থেকে দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে বলেও জানান সমিতির নেতারা।
সংগঠনটির চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— প্রতি ঘনমিটার সিএনজি বিক্রিতে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১৩ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ, ভবিষ্যতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমিশন সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু করা, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পুরোনো গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত জামানত নেওয়ার প্রথা বাতিল এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভূমি ইজারাসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার লাইসেন্স ও নবায়ন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
কেকে/এলএ