ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই কাঁধে ধানের চারা, হাতে কোদাল আর মুখে নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে ছুটছেন কৃষকরা। কারও পায়ের নিচে কাদামাটি, কারও কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক ধানের চারা রোপণের দৃশ্য। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, যেন সবুজের এক বিশাল ক্যানভাস আঁকছেন তারা। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার মাঠগুলো এখন এমনই এক প্রাণচঞ্চল রূপে সেজে উঠেছে।
বর্ষার টানা বৃষ্টিতে জমিতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নারী-পুরুষ কৃষি শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে গ্রামের মাঠ। কোথাও বীজতলা থেকে চারা তুলে আনা হচ্ছে, আবার কোথাও সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন কৃষকরা। প্রকৃতি আর মানুষের পরিশ্রম যেন একসঙ্গে মিলেমিশে নতুন এক সম্ভাবনার গল্প লিখছে।
উপজেলার আলোকঝাড়ী, ভাবকী, ভেড়ভেড়ী, গোয়ালডিহি, আঙ্গারপাড়া, খামারপাড়া ও আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ঘুরে দেখা যায়, আমন রোপণের কাজে এখন কৃষকদের দম ফেলারও সময় নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রোপণ শেষ করতে অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়েও মাঠে কাজ করছেন। শ্রমিক সংকট থাকলেও থেমে নেই চাষাবাদ। কারণ, কৃষকদের বিশ্বাস—সময়মতো চারা রোপণ করতে পারলে ফলনও ভালো হবে।
কৃষকদের ভাষায়, এ বছর প্রকৃতি অনেকটাই সহায় হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেচের খরচ কমেছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও কিছুটা কম হবে। তবে সার, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও ভালো ফলনের আশায় তারা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে খানসামা উপজেলায় ১৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি জমিতেও দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। কৃষি বিভাগের আশা, অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শতভাগ আবাদ সম্পন্ন হবে।
কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ৩ হাজার ৫০০ জন কৃষককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক কৃষককে ৫ কেজি ধান বীজ, ১০ কেজি ডিএপি সার এবং ১০ কেজি এমওপি (পটাশ) সার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের জমি পরিদর্শন করে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘চলতি মৌসুমে খানসামা উপজেলায় ১৩ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ৩ হাজার ৫০০ জন কৃষককে ৫ কেজি ধান বীজ, ১০ কেজি ডিএপি সার এবং ১০ কেজি এমওপি (পটাশ) সার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৭১ হাজার ৬৯৭ মেট্রিক টন আমন ধান উৎপাদনের আশা করছি। কৃষকদের সময়মতো চারা রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা ও রোগবালাই দমনে নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। এতে ভালো ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
কৃষি বিভাগের এমন আশাবাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন কৃষকরাও। তাদের বিশ্বাস, প্রকৃতি যদি শেষ পর্যন্ত সহায় থাকে এবং বড় ধরনের কোনো বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা রোগবালাই আঘাত না হানে, তাহলে এ বছরের আমন মৌসুম হবে স্মরণীয়। আজ যে মাঠে কৃষকদের ঘামে ভিজছে মাটি, কয়েক মাস পর সেই মাঠই সোনালি ধানের শীষে ভরে উঠবে। আর তখন এই সবুজ মাঠই হয়ে উঠবে কৃষকের হাসি, স্বপ্ন আর সাফল্যের প্রতীক।
কেকে/ এমএস