বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে আবারও তৈরি হয়েছে চরম দ্বিমুখী বিতর্ক। একদিকে কক্সবাজারের পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নেওয়া প্রকল্পের কাজ আইনি জটিলতায় আটকে যাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
অন্যদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের আইনি পদক্ষেপে আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির নেপথ্যে পরিবেশ রক্ষার যৌক্তিকতা উঠে এসেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়নকাজ পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, পরিবেশ ও অবকাঠামোগত পরিকল্পিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বারবার উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণের আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
শনিবার( ২৬ সেপ্টম্বর) কক্সবাজার কলাতলী এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লাবণী পয়েন্ট থেকে রামাডা হোটেলের সামনে দিয়ে মেরিন ড্রাইভ সংযোগ তৈরি করতে ১২৮ কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। ঠিকাদার কাজ শুরু করার পূর্বমুহুর্তে একটি সংস্থা বা পরিবেশবাদী একটি সংস্থা আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে।
তিনি আরও দাবি করেন, সমুদ্র তীরবর্তী ৩০০ মিটারের মধ্যে যেকোনো স্থাপনা বা উন্নয়নে (নিষেধাজ্ঞা) থাকায় পুরো নগরীর উন্নয়ন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, উন্নয়নকাজে বারবার বাধা এলে পর্যটন নগরীর আধুনিকায়ন কীভাবে সম্ভব?
যদিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উন্নয়নের গতি থমকে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে, তবে বেলার রিট এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা অনুযায়ী এ সব আইনি পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার জরুরি মনে করছে সচেতন মহল। কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধে হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা আপাতত বহাল রয়েছে। আদেশটি স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ এ সংক্রান্ত রুল হাইকোর্টে নিষ্পত্তি করতে বলেছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ সোমবার এ আদেশ দেন।
২৫ অক্টোবর দুই সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ও ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোনে’ কক্সবাজার পৌরসভার সড়ক (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার) নির্মাণ কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) গত মাসে রিট করে।
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুলসহ অন্তবর্তীকালীন আদেশ দেন। বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধে আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরে কোট স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে।
রুলে কক্সবাজার পৌরসভার ওই সড়ক নির্মাণরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে নির্মিত ওই সড়কের অংশবিশেষ অপসারণ করে সমুদ্রসৈকত ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে পরিবেশসচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবসহ বিবাদীরা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। আবেদনটি আপিল বিভাগের আজকের কার্য তালিকায় ১০ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী।
বেলার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী। তার সঙ্গে ছিলেন বেলার প্রধান নির্বাহী আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফ আলী ও হাসানুল বান্না।
আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের করা লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে আদেশ দিয়েছেন বলে জানান আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী।
আপিল বিভাগ বলেছেন, বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা চলামান থাকবে, হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত। ফলে সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমে হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা আপাতত বহাল থাকছে।
হাইকোর্টের আদেশের পর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বেলা জানিয়েছিল, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ও ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোনে’ কক্সবাজার পৌরসভা ওই সড়ক নির্মাণ করছে। ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় জাইকার অর্থায়নে সৈকতের বিশাল এলাকা ভরাট করে প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হলে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা এর প্রতিবাদ করেন।
সড়ক নির্মাণের জন্য উপকূল সুরক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত বহু বছরের বালিয়াড়ি নির্বিচার এক্সক্যাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে সৈকতের পরিবেশের জন্য অপরিহার্য উদ্ভিদ সাগরলতাসহ লাল কাঁকড়া ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্রের আবাসস্থল।
সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে এবং নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে এর আগে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায় ও আদেশ দিয়েছেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছিল বেলা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করে কক্সবাজার পৌরসভার সৈকতের বুক চিরে সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে এবং বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত রক্ষায় জনস্বার্থে রিটটি করে বেলা।
কক্সবাজারে সচেতন মহল মনে করছে, উপকূলীয় ইকোসিস্টেম ও বালিয়াড়ি ধ্বংস: সমুদ্র সৈকতের একদম নিকটবর্তী (৩০০ মিটার জোন) স্থানে ভারী নির্মাণ, রাস্তা বা পাকা স্থাপনা তৈরি করলে সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি এবং লাল কাঁকড়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র ও বাসস্থান স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, প্রাকৃতিকভাবে সৈকত রক্ষা করে বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় বনভূমি। সমুদ্রের এত কাছে রাস্তা বা কংক্রিট অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় সৈকতের বালু ধুয়ে গিয়ে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। কক্সবাজারের সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবণী পয়েন্ট সংলগ্ন সৈকতের সংবেদনশীল এলাকা রক্ষা করা না গেলে পর্যটন আকর্ষণ এবং জীববৈচিত্র দুটিই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার এ দ্বন্দ্ব নিরসনে সাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকার আমলে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা/মন্ত্রী কমিটি কাজ করছে। খুব দ্রুত সময়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে কীভাবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সমাধান আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম জানান, মন্ত্রীর এমন মন্তব্য যারা বালিয়াড়ি দখল করছে তাদের উৎসাহ যোগাবে। ইসিএ আইন মান্য করে উন্নয়ন দেশের সকলে চায়। কিন্তু পরিবেশ নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন কক্সবাজারবাসী মেনে নেবে না।
কেকে/এআই