দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সামনে আনছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় সংকটের সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা এবং সর্বমহলে তার মার্জিত ও বিচক্ষণ ভাবমূর্তির কারণে রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তবে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছেন তারা। তাদের ভাষ্য, তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার প্রতিও পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ময়মনসিংহের একাধিক তৃণমূল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘মির্জা ফখরুল স্যারকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখলে শুধু দলের নেতাকর্মীরাই খুশি হবেন না, বরং সাধারণ মানুষও একজন যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসানোর আনন্দ পাবে। ত্যাগ ও নিষ্ঠার যে মূল্যায়ন হওয়া উচিত, তা তাকে রাষ্ট্রপতি করার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে।’
এ ছাড়া বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটে দলের পাশে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় বারবার কারাবরণ, মামলা মোকাবিলা এবং দলকে সংগঠিত রাখার কারণে তিনি নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
একই সঙ্গে তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, শালীন রাজনৈতিক আচরণ এবং দল-মতনির্বিশেষে গ্রহণযোগ্যতা তাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে বলে তাদের অভিমত। পাশাপাশি শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম একজন নেতা বলেও মনে করছেন তৃণমূলের নেতারা।
তৃণমূল বিএনপির নেতারা বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে সংবিধান রক্ষা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সে বিবেচনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের জন্য একজন গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ পছন্দ হতে পারেন। তাদের মতে, তিনি সব রাজনৈতিক দলের কাছেই সম্মানিত ব্যক্তি। তার ব্যক্তিগত সততা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা রাষ্ট্রপতির পদকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও মতামত থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর। এর আগে তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাওয়ার মতামত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ আলোচনাতেও উঠে এসেছে।
দলের একটি বড় অংশ মনে করে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেবল একজন অভিভাবক নন, তিনি একজন অত্যন্ত সক্রিয় রাজনীতিবিদ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনার জন্য দলের অভ্যন্তরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সম্ভাব্যদের তালিকায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক নেতার মতে, তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
যদিও এ বিষয়ে দল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবু অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মির্জা ফখরুলের নামই পছন্দের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তাকে নিয়েও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির আরও কয়েকজন প্রবীণ, বর্ষীয়ান ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, এমন একজন ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যিনি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও মর্যাদাসম্পন্ন এবং জাতীয় ঐকমত্য তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পরামর্শের ভিত্তিতে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুর মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবেন, দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করবেন। তবে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক বিবেচনায় তাদের পছন্দ দলের বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, ত্যাগ ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সর্বজনগ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আমি একজন রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাই। যিনি জীবনের কয়েক দশক এ দেশের জনগণের জন্য কাজ করেছেন। যিনি জনগণের পালস বোঝেন। জনগণের আবেগ, অনুভূতি ও প্রত্যাশা বোঝেন। এ ধরনের ত্যাগী, সৎ, নিষ্ঠাবান, সংগ্রামী ও আত্মনিবেদিত মানুষকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদ দেশের একটি সাংবিধানিক অভিভাবকত্বের প্রতীক। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যক্তিগত সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা রক্ষা করার সক্ষমতা থাকতে হবে। এমন একজন বর্ষীয়ান ও ত্যাগী রাজনীতিবিদকে আমি দেখতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে দুই-তিনজন রাষ্ট্রপতি ছাড়া অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি তাদের পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেননি। এর বড় কারণ হলো, রাষ্ট্রপতিরা যখন নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েছেন, তখন তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। আবার রাজনৈতিক নানা ঘটনা, চড়াই-উৎরাই ও অস্থিতিশীলতার কারণেও অনেকের দায়িত্বকাল আগেই শেষ হয়েছে।’
সাইফুল হক বলেন, ‘আমি আশা করি, এবার আমরা পূর্ণ মেয়াদের জন্য এমন একজন রাষ্ট্রপতি পাব, যার যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও সততা নিয়ে সরকার, বিরোধী দল কিংবা জনগণের কোনো অংশেরই সন্দেহ থাকবে না। এমন একজন সর্বজনগ্রাহ্য, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির অধীনে পরবর্তী নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। সেই সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে রাষ্ট্রপতিকে পরবর্তী নির্বাচন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার—উভয়ের ক্ষেত্রেই এক ধরনের রাজনৈতিক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হবে। সে কারণে ওই দায়িত্ব পালনের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষের প্রয়োজন হবে।’
কেকে/এলএ