ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের আবাসিক হল ‘জুলাই ৩৬’ হলের এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে গোপনে একাধিক ছাত্রীর ছবি তুলে বয়ফ্রেন্ডকে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই হলজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অন্তত ১০ জন ছাত্রীর ছবি শনাক্ত করা হয়েছে। তারা অভিযোগের সমর্থনে কিছু স্ক্রিনশটও সংরক্ষণ করেছেন বলে দাবি করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত রাত ১০টার দিকে জুলাই ৩৬ হলে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর নাম তুবাউল জান্নাত ঐশী। তিনি জুলাই ৩৬ হলের আবাসিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হলের শিক্ষার্থীরা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে একাধিক ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে লন্ডনপ্রবাসী আবিদ নামের এক ছেলেকে গোপনে তিনি বিভিন্ন সময় হলের মেয়েদের ছবি তুলে পাঠাতেন। এর মধ্যে যেসব মেয়ে বাইরে বোরকা পরে নেকাব করে বের হতো, তাদেরও বিভিন্ন আপত্তিকর ছবি তুলতেন তিনি। একপর্যায়ে লন্ডনপ্রবাসী আবিদের সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়।
এ সময় আবিদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকাকালীনই অভিযুক্ত ছাত্রী দ্বিতীয় আরেকটি ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্ত ছাত্রীর ওপর প্রতিশোধ নিতে আবিদ তার কাছে থাকা বিভিন্ন মেয়ের ছবি এবং তাদের নিজেদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তার পরিচিত হলের অন্যান্য মেয়েদের মেসেঞ্জারে পাঠাতে থাকেন। এ সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা তাদের ছবি আবিদ কীভাবে পেল—জানতে চাইলে তিনি অভিযুক্ত ছাত্রীর অপকর্মের কথা ফাঁস করে দেন।
ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, “হলের ভেতরে আমরা আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যমতো থাকি, যেহেতু এখানে বাইরের কেউ বা কোনো ছেলের অ্যাকসেস নেই। এই মেয়ে তার রুমমেটদের ছবি, যেমন কেউ শুয়ে আছে, বসে আছে, কেউ হয়তো টি-শার্ট পরে আছে, কেউ ওড়না ছাড়া আছে—এই টাইপের ছবিগুলো তুলে তুলে তার বয়ফ্রেন্ডকে দিয়েছে। শুধু তা-ই না, হলের অন্যান্য মেয়েদের অনেক বাজে বাজে ছবি, ঘুমন্ত অবস্থার ছবি তুলে তুলে তার একেকজন বয়ফ্রেন্ডকে এভাবে পাঠিয়েছে। এটা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। কেউ কখনোই এভাবে মেয়েদের ছবি তুলতে পারে না।”
আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, “আমি আমার রুমে যেকোনো ভঙ্গিতে থাকতেই পারি। কারণ এটা আমার হল, আমার রুম আমার কমফোর্ট জোনের জায়গা। এই মেয়ে আমাদের হলের একদম বোরকা-নেকাব পরে, পর্দানশীল এক মেয়েরও ওড়না ছাড়া ছবি তুলে তার বয়ফ্রেন্ডকে পাঠিয়েছে। তাও একটা না, সাত-আটটা ছবি। তার বয়ফ্রেন্ড যে অন্য ছেলেদেরকে আমাদের এসব ছবি পাঠায়নি, তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নাই। আমরা যদি রুমের ভেতরে নিরাপত্তা না পাই, তাহলে কোথায় পাবো?”
ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আরও শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আজ শুক্রবার হল প্রশাসনের কাছে অভিযুক্ত ছাত্রীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিলেরও প্রস্তুতি নিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আবিদের কথোপকথনের একাধিক অডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তাতে আবিদকে বলতে শোনা যায়, “যদি আমি সঙ্গে সঙ্গে ছবিগুলো সেভ না করে ফেলতাম, তাহলে আমার কাছেও প্রমাণ থাকত না। আমি ওকে অনেকবার নিষেধ করেছি এগুলো দিতে, কিন্তু শুনে একটা বিশ্রী হাসি দিত। ও যে কী পৈশাচিক আনন্দ পায় এগুলো করে, আমিও জানি না। আর এগুলো অন্য কারও কাছে দিয়েছে কি না, এটাও আমি জানি না। আমি চাই ওর শিক্ষা হোক।”
শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী নিজের দোষ স্বীকার করে বলেছেন, “আমি ছবি দিয়েছি, তখন আমি বুঝিনি। এটা নিয়ে যদি স্যারের কাছে যেতে হয়, তোরা যা, আমার কিছু করার নেই। আমি ভুল করেছি, অন্যায় করেছি, সেটার জন্য আমি স্যরি বলছি। মাফ চাইতে আমার কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এটা সত্য কথা, এখন তুই যদি বলিস এতো বড় মেয়ের কমনসেন্সের অভাব, কমনসেন্সের অভাব হলে হলো, নাহয় যদি মনে করিস, ইচ্ছা করে এটা করেছি, তো তাই। আসলে আমার মাথায় এই সেন্সটাই আসেনি যে ভবিষ্যতে এমন কিছু হতে পারে।”
তবে এ বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে কোনো পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জুলাই-৩৬ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শামছুল হক ছিদ্দিকীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। অভিযোগ পেলে বিষয়টি অবশ্যই তদন্ত করা হবে। তদন্তে কারা জড়িত তা প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কেকে/এলএ