শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬,
৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের স্বত্ব নেই: হাইকোর্ট      আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার নতুন দিগন্তে চট্টগ্রাম ওয়াসা      দলের কাণ্ডারি থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবক      তামিমকে টপকে টেস্টে মোমিনুলের রেকর্ড      সবার মতামত নিয়েই সংবিধান সংশোধন হবে : চিফ হুইপ      রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : ইসিতে তিনটি মনোনয়নপত্র দাখিল      মগবাজারে বহুতল ভবনে আগুন      
দেশজুড়ে
হাতিয়ায় স্কুলের প্রথম জিপিএ-৫ পাওয়া তাসফিয়ার স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩০ পিএম আপডেট: ১৪.০৮.২০২৬ ৩:৪৬ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

নানা প্রতিকূলতা আর অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছে তাসফিয়া। ছোটবেলা থেকেই মায়ের মমতা আর বাবার স্নেহ ছাড়াই জীবনের পথচলা শুরু হয়েছিল তার। নিজের বলতে ছিল কৃষক চাচার আশ্রয় ও সহযোগিতা।

কিন্তু দারিদ্র্য কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা কোনো কিছুই তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও নিজের স্বপ্নকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেছে সে। আর সেই অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি মিলেছে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ-৫ অর্জনের মাধ্যমে।

তাসফিয়ার এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয় এটি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসেও এক অনন্য মাইলফলক। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম বিদ্যালয়টির কোনো শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। আর সেই ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে বাবা-মা-হারা আশ্রিত ছাত্রী তাসফিয়া।

তাসফিয়ার এই সাফল্যের খবর পৌঁছেছে উপজেলা প্রশাসনের কাছেও। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) তাকে আহ্বান করা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে।

তার পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি কলেজে ভর্তি, প্রাইভেট পড়ানো, যাতায়াত, পোশাক, বই-খাতা ও কলমসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

তবে ফলাফলের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাসফিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। তার বয়স যখন মাত্র ৮ বছর, তখন তার বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এরপর মা তাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। কয়েক বছর পর বাবাও মারা যান। একসময় বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে তাসফিয়া।

এরপর থেকে কৃষক চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াসের আশ্রয়ে বেড়ে উঠতে থাকে সে। চাচার সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তার সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যায় তাসফিয়া। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ও মনোযোগে কখনো ভাটা পড়েনি। প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে থাকে সে।

সহপাঠীদের অনেকেই যখন নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পড়াশোনা করেছে, তখন তাসফিয়াকে এগোতে হয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুতেই ছিল সংকট। তারপরও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি সে। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ এবং নিজের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছে সাফল্যের পথে।

ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আনন্দে ভাসে তাসফিয়ার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। বিশেষ করে রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করছেন, তাসফিয়ার এই সাফল্য বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় আরও উৎসাহিত করবে।

তাসফিয়ার চাচা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, “তাসফিয়া ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে। বাবা-মা না থাকায় তার কষ্টটা আমরা বুঝতে পারি। কৃষি কাজ করে নিজের শত অভাবের মধ্যেও তাকে নিজের মেয়ের মতো করে রেখেছি। সে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। তার এই সাফল্যে আমাদের সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। আমি চাই, ভবিষ্যতেও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক।”

রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জগদীস চন্দ্র দাস বলেন, “তাসফিয়া অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কখনো পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়নি। তার জিপিএ-৫ অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাসফিয়ার এই অর্জন আমাদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি দিদারুল ইসলাম সবুজ বলেন, “তাসফিয়ার সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। বাবা-মা না থাকার পরও চাচার কাছে থেকে সে যে কঠোর পরিশ্রম করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার মতো শিক্ষার্থীদের পাশে সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষদের দাঁড়ানো উচিত।”

তবে এখানেই থেমে থাকতে চায় না তাসফিয়া। তার স্বপ্ন আরও বড়। ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চায় সে। শুধু নিজের জীবন বদলানো নয়, নিজের মতো প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের পাশে দাঁড়াতে চায়। 

তাসফিয়া বলেন, “বাবা-মা না থাকায় ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছি। চাচা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। শিক্ষকরাও সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়ে আমি খুব আনন্দিত। ভবিষ্যতে আমি শিক্ষক হতে চাই। আমার মতো যারা কষ্টের মধ্যে আছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই এবং পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে চাই।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, “রেহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩১ বছরের ইতিহাসে প্রথম জিপিএ-৫ অর্জন করেছে তাসফিয়া। তার এই সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এটি তার মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ। তার স্বপ্ন পূরণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। বৃত্তি প্রদানসহ সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। তাসফিয়া যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকবে।”


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  হাতিয়া   এসএসসি   শিক্ষক  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close