কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের পাঁচ বছর পর অবশেষে মূল সড়কের সঙ্গে সংযোগ পেতে যাচ্ছে নতুন সেতু। দীর্ঘদিন ধরে সংযোগহীন অবস্থায় পড়ে থাকা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়কের রেনুরছড়া খালের ওপর নির্মিত সেতুটির সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে।
জাতীয় দৈনিক খোলা কাগজে ‘সংযোগবিহীন সেতু যেন গলার কাঁটা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (১৭ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন সেতুটির দুই পাশে মূল সড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য মাটি ভরাটের কাজ চলছে।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, নতুন সেতুটি নির্মাণের পরও সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করায় কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা বছরের পর বছর কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে ছিল। এর বিপরীতে সেতুর পাশেই শতবর্ষী পুরোনো একটি জরাজীর্ণ সেতু দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ও যানবাহন চলাচল করেছে।
পুরোনো সেতুটির পিলারে ফাটল, রেলিং ভাঙা এবং দুই পাশের সংযোগ সড়কের অংশ ধসে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ভারী বৃষ্টিতে সেতুর নিচের মাটি সরে যাওয়া ও সংযোগস্থলের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লেও বিকল্প পথ না থাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়নি।
ঈদগড় সিএনজি সমিতির সভাপতি ও চালক মো. ফয়সাল বলেন, নতুন সেতু নির্মাণের পর থেকেই স্থানীয় মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন কবে সেটি দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হবে। কিন্তু বছরের পর বছর সেতুটি পড়ে থাকায় চালক ও যাত্রীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘পুরোনো সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। সেতুটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, প্রতিবার পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে রাতে ও বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।’
ফয়সাল আরও বলেন, ‘নতুন সেতুর সংযোগের কাজ শুরু হওয়ায় আমরা খুশি। দ্রুত কাজ শেষ করে এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দিলে চালকদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগও অনেকটা কমবে।’
সিএনজি চালক মো. আবুল বাশার বলেন, পাঁচ বছর ধরে নতুন সেতু চোখের সামনে থাকলেও সেটি ব্যবহার করতে পারিনি। সেতুটি নির্মাণের পর মনে হয়েছিল মানুষের দুর্ভোগ শেষ হবে। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, ‘পুরোনো সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিদিন ভয় কাজ করে। বিশেষ করে ভারী যানবাহন পার হওয়ার সময় সেতুটি কেঁপে ওঠে। কোনো কারণে সেতুটি ভেঙে পড়লে ঈদগড় ও বাইশারীর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।’
তার মতে, নতুন সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করে চালু করা হলে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা দূর হবে।
ট্রাকচালক মো. আবু ছৈয়দ বলেন, ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়ক দিয়ে নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যান চলাচল করে। কিন্তু পুরোনো সেতুটির অবস্থা ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়।
তিনি বলেন, ‘সেতুটির বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। দুই পাশের সংযোগ অংশও অনেক আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাক নিয়ে সেতু পার হওয়ার সময় চালকদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। অনেক সময় মনে হয়, সামান্য ভুল হলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
আবু ছৈয়দ বলেন, নতুন সেতুর সংযোগের কাজ শুরু হয়েছে—এটা আমাদের জন্য আনন্দের খবর। তবে কাজ যেন ধীরগতিতে না চলে এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
টমটমচালক মো. মুহিন বলেন, প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী নিয়ে তাকে এই সড়কে চলাচল করতে হয়। পুরোনো সেতুটির অবস্থা ভালো না থাকায় যাত্রীদেরও আতঙ্কের মধ্যে সেতু পার হতে হয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক যাত্রী পুরোনো সেতু দেখেই ভয় পান। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি দেখা যায়। বর্ষাকালে সেতুর আশপাশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।’
তিনি দ্রুত নতুন সেতুর সংযোগের কাজ শেষ করার দাবি জানিয়ে বলেন, নতুন সেতুটি চালু হলে শুধু যানবাহন চলাচলই সহজ হবে না, মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
অটোচালক মো. মঞ্জুর বলেন, এই সড়ক শুধু যাতায়াতের পথ নয়, ঈদগড় ও বাইশারী এলাকার মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। প্রতিদিন মানুষ পণ্য নিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করেন।
তিনি বলেন, সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ সেতু থাকায় যান চলাচলে সমস্যা হয়েছে। এতে সময় ও জ্বালানি দুটিই বেশি খরচ হয়েছে। নতুন সেতু চালু হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবেন।
মঞ্জুরের দাবি, সংযোগের কাজ দ্রুত শেষ করে সেতুটি চালু করা হোক। একই সঙ্গে পুরোনো সেতুটিও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অপসারণ বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
মাইক্রোবাস চালক মো. লালু বলেন, নতুন সেতুটি নির্মাণের পর থেকেই আমরা দেখছি এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একটি সেতু তৈরি হয়ে পড়ে আছে, অথচ পাশের পুরোনো সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে—বিষয়টি সত্যিই হতাশাজনক।
তিনি বলেন, এই সড়কে যাত্রী পরিবহনকারী মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। পুরোনো সেতুর কারণে চালকদের বাড়তি ঝুঁকি নিতে হয়। নতুন সেতুর সংযোগের কাজ শুরু হওয়ায় এখন আমরা আশাবাদী।
তিনি বলেন, কাজটি দ্রুত শেষ হলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে সেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ সড়কের কাজও শেষ করার দাবি জানান তিনি।
ঈদগড় ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. খুরশেদ আলম বলেন, রেনুরছড়া খালের ওপর নতুন সেতুটি নির্মাণের পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় সেই আশা দীর্ঘদিন পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, সেতুটি নির্মাণের পর পাঁচ বছর ধরে সেটি কার্যত ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে ছিল। এদিকে পুরোনো সেতুটি দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পিলারে ফাটল, রেলিং ভাঙা এবং সংযোগ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল সবসময়।
খুরশেদ আলম বলেন, এই সড়ক দিয়ে ঈদগড়, বাইশারীসহ আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। তাই নতুন সেতুর সংযোগের কাজ শুরু হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত কাজ শেষ করে সেতুটি চালু করা হলে মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু মাটি ভরাট করলেই হবে না; সংযোগ সড়কটি টেকসই ও মানসম্মতভাবে নির্মাণ করতে হবে। বর্ষার পানি ও পাহাড়ি ঢলের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কাজ করা প্রয়োজন।
ঈদগড় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন সিকদার বলেন, ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়কের রেনুরছড়া সেতুটি এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো সেতুর কারণে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছে।
তিনি বলেন, নতুন সেতু নির্মাণের পরও সংযোগ না থাকায় মানুষ এর সুফল পাচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছিল। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সমস্যাটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। এখন সংযোগের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় মানুষ স্বস্তি পেয়েছেন।
জসিম উদ্দিন সিকদার বলেন, কাজটি দ্রুত শেষ করে নতুন সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলে ঈদগড় ও আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন, রোগী বহন এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতও সহজ হবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কাজটি দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ করার আহ্বান জানান।
স্থানীয়দের মতে, রেনুরছড়া খালের ওপর নতুন সেতুটি নির্মাণের পর পাঁচ বছর ধরে সংযোগহীন অবস্থায় পড়ে থাকা ছিল উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় ধরনের অসংগতি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার না হওয়ায় যেমন সরকারি অর্থের সুফল মানুষ পায়নি, তেমনি পুরোনো সেতুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে।
এতে একদিকে নতুন সেতু পড়ে থেকেছে নীরব সাক্ষীর মতো, অন্যদিকে পুরোনো সেতুটি প্রতিদিন শত শত মানুষ ও যানবাহনের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের সাক্ষী হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, অবশেষে সংযোগের কাজ শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে তাদের প্রত্যাশা, এবার যেন কাজ শেষ করতে আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়।
এ বিষয়ে রামু উপজেলা প্রকৌশলী মো. কফিল উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করে নতুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে শতবর্ষী ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হোক।
কেকে/ এমএস