বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। বর্তমানে আমদানি ও গ্রিডভুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু এ ব্যাপক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরও একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আর্থিক দায় আমরা কতদিন এবং কীভাবে বহন করব?
গ্রাহকের জন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী রাখতে সরকার বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে আসছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় এগারো শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের বাইরে ভর্তুকি ব্যয়কে আরও ভারী করে তুলছে। চলতি অর্থবছরেই বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আর আগামী অর্থবছরে এই খাতে ভর্তুকির চাহিদা দাঁড়াতে পারে অন্তত ৭০ হাজার কোটি টাকায়।
বার্ষিক জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাতগুলোর একটি। এই সংখ্যাগুলো প্রমাণ করে, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি আর সাময়িক সহায়তার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাষ্ট্রীয় বাজেটের একটি কাঠামোগত ও ক্রমবর্ধমান অংশ হয়ে উঠেছে।
ভর্তুকি কোনো খারাপ বিষয় নয়। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখা কিংবা সাময়িক সংকট মোকাবিলায় ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ভর্তুকি সাময়িক সহায়তা থেকে স্থায়ীভাবে ব্যয় ও অদক্ষতার ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
ভর্তুকির অর্থনৈতিক চক্র
বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে সমস্যাটি শুধু উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়, সক্ষমতা ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ, বিভিন্ন চুক্তিগত দায়, জ্বালানি ব্যয়, অর্থায়ন ব্যয়, বকেয়া এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়—সব মিলিয়ে একটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জের প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল-কুইক রেন্টাল) কেন্দ্রগুলোকে গত পনেরো বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় এক লাখ সাত হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে, যার প্রায় ষাট শতাংশই ব্যয় হয়েছে সর্বশেষ পাঁচ বছরে—অর্থাৎ ব্যয়ের গতি ক্রমেই ত্বরান্বিত হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে এ চার্জ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকায়, যা আগামী অর্থবছরে বেড়ে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব হিসাবেই দেখা যায়, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ভর্তুকিবিহীন প্রকৃত ব্যয়ের প্রায় চল্লিশ শতাংশই যাচ্ছে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ মেটাতে—এমনকি যেসব কেন্দ্র কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদনই করছে না, সেগুলোর জন্যও।
সরকার ভর্তুকি দেয় → সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি পূরণ হয় → কিন্তু কাঠামোগত ব্যয় কমে না → আবার ঘাটতি তৈরি হয় → বকেয়া বাড়ে → ঋণ ও সুদের বোঝা বাড়ে → পরবর্তী সময়ে সরকারের ওপর আরও বড় আর্থিক দায় আসে। এভাবে ভর্তুকি অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান বাড়লেই কি দক্ষতা বাড়ে?
বিদ্যুৎ খাতকে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—এ তিন স্তরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার পেছনে দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর যৌক্তিকতা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—বিভিন্ন স্তরে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির ফলে প্রকৃত অর্থে কতটা দক্ষতা বেড়েছে এবং কতটা অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি হয়েছে?
প্রশ্নটি হওয়া উচিত—কতগুলো কোম্পানি আছে তা নয়; প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ কত বাড়াচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ওপর কত আর্থিক দায় তৈরি করছে।
যদি একই কাজ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং তার ফলে শুধু প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যয় বাড়ে, তাহলে সেই কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, উৎপাদন ক্ষমতার সিংহভাগ ব্যবহারই হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এক অর্থবছরে দেশের উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় বাষট্টি শতাংশ অলস বসে থাকা সত্ত্বেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সতেরো হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হোক বা না হোক, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকেই যায়। এ কাঠামোগত বাস্তবতাই ভর্তুকির প্রকৃত চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ—এখানে সমস্যাটি কেবল গ্রাহকমূল্য কম রাখার নয়, বরং চুক্তিগত কাঠামোর মধ্যে অন্তর্নিহিত এক ধরনের কাঠামোগত অদক্ষতারও।
আন্তর্জাতিক চাপ ও নীতিগত দ্বিধা
এই সংস্কারের প্রশ্নটি এখন নিছক অভ্যন্তরীণ নীতি-আলোচনার বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ঋণ-সংক্রান্ত আলোচনাতেও এটি কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে। পূর্ববর্তী ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়ব্যবস্থা, রাজস্ব খাতের সংস্কার ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের মতো শর্তে যথেষ্ট অগ্রগতি না হওয়াকেই সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা পুরোনো ঋণ কর্মসূচি থেমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন। সরকার এখন নতুন করে প্রায় চারশো থেকে সাড়ে চারশো কোটি ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যেখানে ভর্তুকি প্রত্যাহারের শর্তই ফের প্রাধান্য পাচ্ছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে কৃষি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত ভর্তুকি অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে সরকার অনড় এবং জনস্বার্থের পরিপন্থি মনে হলে কোনো শর্তই নির্বিচারে মেনে নেওয়া হবে না। এই দ্বন্দ্বই আসলে প্রবন্ধের মূল প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষè করে তোলে—ভর্তুকি প্রত্যাহার নাকি ভর্তুকির যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, কোন পথে বাংলাদেশ এগোবে?
এখন প্রয়োজন ভর্তুকি সংস্কার
সরকারের এখনই গত ১৭ বছরের বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির একটি পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা বা ভর্তুকি অডিট করা উচিত। কত টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে গেছে, কোন কারণে গেছে এবং এর বিনিময়ে কী ধরনের কার্যকর ফল পাওয়া গেছে—এসব তথ্য একটি সমন্বিত কাঠামোয় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ভর্তুকিকে তিন ভাগে দেখা যেতে পারে—
প্রথমত, জনগণের প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা; দ্বিতীয়ত, জাতীয় অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থে প্রয়োজনীয় সহায়তা; তৃতীয়ত, অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট ঘাটতি। তৃতীয় ধরনের ভর্তুকি কোনোভাবেই স্থায়ী হতে দেওয়া উচিত নয়।
প্রতিটি সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক মূল্য যাচাই বা ইকোনমিক ভ্যালু টেস্ট করা দরকার। কোনো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে, নাকি শুধু একটি স্তর থেকে আরেক স্তরে অর্থ স্থানান্তর করছে—তা নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান একীভূত, পুনর্গঠন কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাঠামো বিলুপ্ত করতে হবে।
এ ধরনের নিরীক্ষা ও পুনর্গঠন কোনো নতুন বা অভাবনীয় ধারণা নয়। বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়, লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি বৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে, যাতে ভর্তুকি প্রত্যাহারের ধাক্কা সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর না পড়ে অথচ রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ—একদিকে অপ্রয়োজনীয় ও অদক্ষতাজনিত ব্যয় ছাঁটাই, অন্যদিকে প্রকৃত প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা।
একইসঙ্গে ভর্তুকির সঙ্গে কার্য সম্পাদন শর্ত বা পারফরম্যান্স কন্ডিশন যুক্ত করা জরুরি। যে প্রতিষ্ঠান ভর্তুকি পাবে, তাকে খরচ কমানো, বকেয়া আদায়, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক সংস্কারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।
জনগণের জন্য ভর্তুকি, অদক্ষতার জন্য নয়
ভর্তুকি যদি প্রয়োজন হয়, তা যেন সরাসরি প্রয়োজনীয় গ্রাহককে সহায়তা করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা বা অতিরিক্ত ব্যয়কে বছরের পর বছর জনগণের করের অর্থ দিয়ে ঢেকে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন কত বাড়ল—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।
একইসঙ্গে জানতে হবে—
এই বিদ্যুতের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য কত? রাষ্ট্র কত টাকা দিচ্ছে? কেন দিচ্ছে? এবং এই ব্যয় কতদিন চলবে? বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিক ভর্তুকি নয়, বরং ভর্তুকি সংস্কার। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা থাকবে, জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ থাকবে; কিন্তু অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায় অনির্দিষ্টকাল জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
ভর্তুকি সমস্যার সমাধান হতে পারে—যদি তা সঠিক জায়গায় যায়। কিন্তু ভর্তুকি যদি সমস্যার কারণগুলো আড়াল করে রাখে, তাহলে আজকের ভর্তুকিই আগামী দিনের আরও বড় আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার। ভর্তুকি প্রত্যাহারের আন্তর্জাতিক চাপ যেমন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দ্রুত ভর্তুকি তুলে নেওয়াও সমাধান নয়। প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও পর্যায়ক্রমিক সংস্কার-পরিকল্পনা, যেখানে প্রতিটি টাকার ভর্তুকির হিসাব জনসমক্ষে থাকবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষতা প্রমাণের শর্তে আবদ্ধ করা হবে। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতা সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে—সংস্কার যত পিছিয়ে যাবে, ভবিষ্যতের আর্থিক দায় ততই ভারী হয়ে উঠবে।
লেখক : প্রকৌশলী, সদস্য- এ্যাব